জলচক্র (Hydrological Cycle):

সংজ্ঞাঃ ভৌগোলিক অবস্থান ও ভৌত অবস্থার বিভিন্ন পরিবর্তন (কঠিন, তরল ও গ্যাসীয়) ও বিনিময়ের মধ্য দিয়ে চক্রাকারে বারিমন্ডল, বায়ুমন্ডল ও স্থলভাগের জলের সামগ্রিক পরিমাণের সমতা বজায় থাকে । জলের এই চক্রাকার আবর্তনপথকে জলচক্র (Hydrological Cycle) বলে ।

ব্যাখ্যাঃ জল তিনটি অবস্থায় সাধারণত থাকতে পারে যথা – কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় অবস্থায় । এই তিনটি অবস্থায় ভৌত রূপভেদ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জল ভূপৃষ্ঠ, ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুমন্ডল, শিলামন্ডল ও বারিমন্ডলে চলমান । সাধারণভাবে বলা যায়, সমুদ্রের জলের পরিমাণ গড়ে সমান থাকে; অর্থাৎ, সমুদ্র থেকে যে পরিমাণ জল বাষ্পীভূত হয়, বিভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়ে ঠিক সেই পরিমাণ জলই কালক্রমে সমুদ্রে ফিরে আসে এবং জলের এই সামগ্রিক প্রবাহপথটি চক্রাকার । জলবিজ্ঞানীরা জলচক্ররূপে জলের চলমানতার এই চক্রাকার ধারাটিকেই ব্যাখ্যা করেছেন ।

সূচনা ও সমাপ্তিঃ যদিও জলচক্রের কোনো সূচনা ও সমাপ্তি নেই, তবুও এই চক্র অনুধাবন করার জন্য আলোচনার সুবিধার্থে এর সূচনা মহাসমুদ্র থেকে শুরু করা যেতে পারে ।
নীচে উপস্থাপিত তথ্যাবলীর সাহায্যে সমুদ্র থেকে বাষ্পীভবন এবং বায়ুমন্ডল ও পরবর্তীতে ভূমিভাগ ও মৃত্তিকা শিলার মধ্য দিয়ে জলের সমুদ্রে প্রত্যাবর্তনের ধারাটিকে তুলে ধরা হলো –
বাষ্পীভবনঃ ৪,৪৪,০০০ ঘন কিমি / বছর (সমুদ্র থেকে) + ৭০,০০০ ঘন কিমি / প্রতি বছর ( ভূমিভাগ থেকে) = মোট ৫,১০,০০০ ঘন কিমি / বছর ।                                                                                                                                                                                                 ভূপৃষ্ঠে জলের পরিমাণের সাম্যাবস্থা বজায় রাখার জন্য মোট বাষ্পীভবনের সমপরিমাণ জল পুনরায় বায়ুমন্ডল থেকে ভূপৃষ্ঠ এবং সমুদ্রে প্রত্যাবর্তন করে । অর্থাৎ,
প্রত্যাবর্তনঃ ৪,০৪,০০০ ঘন কিমি / প্রতি বছরে (সমুদ্রে সরাসরি বৃষ্টিপাত) + ১,০৬,০০০ ঘন কিমি / প্রতি বছর (ভূমিভাগে বৃষ্টিপাত) = মোট ৫,১০,০০০ ঘন কিমি (প্রতি বছরে) ।

শ্রেণীবিভাগঃ সমুদ্রকে এক বিরাট জলের ভান্ডার বলে মনে করা হয় । ভূপৃষ্ঠের জল, ভৌমজল, অধঃক্ষেপণের জল রূপান্তরে তুষার প্রভৃতি কালক্রমে এই সামুদ্রিক আধারে পুনরায় ফিরে আসে; যদিও এই প্রত্যাবর্তন সময়সাপেক্ষ হতে পারে ।
                                                              পৃথিবীব্যাপী ঘটমান এই জলচক্রকে মূলত তিনভাগে ভাগ করে আলোচনা করা হয় । যথা –
১. ভূপৃষ্ঠস্থ জল-সমুদ্র আবর্তনঃ বাষ্পীভূত জল কালক্রমে ঘনীভবন ও মেঘ সৃষ্টির পর অধঃক্ষেপণ হিসাবে স্থলভাগে পতিত হয় । এই অধঃক্ষেপণের কিছু অংশ ভূপৃষ্ঠে পৌছাবার আগেই পুনরায় সরাসরি বাষ্পীভূত হয় । পতিত অধঃক্ষেপণের অবশিষ্ট অংশবিশেষ উদ্ভিদ দ্বারা প্রস্বেদন, মৃত্তিকা দ্বারা শোষণ তথা ভৌমজলের সংস্থানের পর ভূপৃষ্ঠপ্রবাহ রূপে প্রবাহিত হয় । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই ভূপৃষ্ঠপ্রবাহের সময় পুনরায় আবার কিছু অংশ বাষ্পীভূত হয় এবং চুড়ান্ত অবশিষ্টাংশ নদীনালা, হিমবাহ, তুষার প্রবাহের মাধ্যমে অবশেষে সমুদ্রে এসে মিশে জলচক্রের একটি আবর্তন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, যা ভূপৃষ্ঠস্থ জল-সমুদ্র আবর্তন নামে পরিচিত ।
২. ভৌমজল-সমুদ্র আবর্তনঃ অধঃক্ষেপণের কিছু অংশ ভৌমজল রূপে সঞ্চিত থাকে । এই ভৌমজল ধীর গতিতে ভূপৃষ্ঠের তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীর জলের সংস্থান করে এবং অবশিষ্টাংশ সরাসরি ধীর প্রবাহের মধ্য দিয়ে সমুদ্রে প্রত্যাবর্তন করে, যা জলচক্রের ভৌমজল-সমুদ্র আবর্তন নামে পরিচিত ।
৩. সমুদ্র-সমুদ্র আবর্তনঃ বাষ্পীভূত জল কালক্রমে ঘনীভবন ও মেঘ সৃষ্টির পর স্থলভাগে অধঃক্ষেপণের পাশাপাশি সমুদ্রভাগের উপরও এক বিরাট পরিমাণ অধঃক্ষেপণ সংঘটিত হয়ে থাকে, যা সরাসরি সমুদ্রভাগে পতিত হয়ে  সমুদ্র-সমুদ্র আবর্তন সম্পন্ন করে ।

(চলবে……)

2 comments

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s