জেট বায়ু কি?

নামকরণঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উর্দ্ধ ট্রপোস্ফিয়ারে চলমান জেট বিমানগুলির গতির অস্বাভাবিক হ্রাস-বৃদ্ধিজনিত ঘটনা থেকেই প্রথম জেট বায়ুর উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল বলে এই বায়ুপ্রবাহের নাম জেট বায়ুপ্রবাহ রূপে প্রচলিত হয়েছে ।

সংজ্ঞাঃ প্রধানত: ৩০° অক্ষাংশে পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত অঞ্চলে বায়ুমন্ডলের ৮-১৫ কিলোমিটার ঊর্দ্ধে ট্রপোস্ফিয়ারে অতি প্রবল গতিসম্পন্ন বায়ুপ্রবাহ পশ্চিম থেকে পূর্বে আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত হয় । এই ঝড়ের মতো তীব্র গতিসম্পন্ন পাইপের ন্যায় হাওয়া বলয়কে জেট বায়ু (Jet Stream) বলে ।

উদাঃ উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, জাপানে ঊর্দ্ধ ট্রপোস্ফিয়ারে জেট বায়ু প্রবাহিত হয় । ভারতে দিল্লী থেকে গুয়াহাটি পর্যন্ত ১৫০ নট বেগে ঊর্দ্ধ ট্রপোস্ফিয়ারে এই বায়ু প্রবাহিত হয় ।

উৎপত্তিঃ নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে তাপীয় ঢালের পার্থক্যের সাথে জেট বায়ুর উৎপত্তির বিশেষ সম্পর্ক আছে । উচ্চ ট্রপোস্ফিয়ারের যে অংশে তাপীয় ঢাল সবচেয়ে বেশী, সেই অংশে জেট বায়ুর উৎপত্তি ঘটে । শীতকালে মেরু অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠে শক্তিশালী উচ্চচাপ ও ট্রপোস্ফিয়ারের ঊর্দ্ধাংশে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় । এর ফলে মেরু অঞ্চলে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে শক্তিশালী ঘূর্ণিবায়ু প্রবাহের সৃষ্টি হয় । এই বায়ুপ্রবাহ যখন নিরক্ষরেখার দিকে আঁকাবাঁকা পথে অগ্রসর হয় তখন তা জেট বায়ুপ্রবাহে পরিণত হয় । অবশ্য এছাড়াও, উপক্রান্তীয় অঞ্চলের ট্রপোস্ফিয়ার – এর ঊর্দ্ধাংশে দুটি ভিন্নধর্মী বায়ুপুঞ্জের মিলনে তাপীয় ঢালের পার্থক্য বেশী হলে জেট বায়ুপ্রবাহ উৎপত্তি লাভ করে ।

বৈশিষ্ট্যঃ জেট বায়ুপ্রবাহ – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) উচ্চতাঃ পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে ৮ – ১৫ কিলোমিটার উর্দ্ধে সংকীর্ণ স্থানের মধ্যে জেট বায়ু প্রবাহিত হয় ।
খ) গতিবেগঃ জেট বায়ুপ্রবাহের গড় গতিবেগ ৩৫০-৪৫০ কিলোমিটার / ঘন্টা ।
গ) প্রবাহকালঃ মূলতঃ শীতের প্রারম্ভে এই বায়ু প্রবাহিত হতে শুরু করলেও তা চলতে থাকে মার্চ – এপ্রিল মাস পর্যন্ত ।
ঘ) প্রবাহের দিকঃ এই বায়ু পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয় । প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে যতই যাওয়া যায় ততই এই বায়ুর গতিবেগ বৃদ্ধি পেতে থাকে ।
ঙ) গতিপ্রকৃতিঃ জেট বায়ুর গতি পরোক্ষভাবে বায়ু সংবহন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে ।
চ) আকৃতিঃ অতি সংকীর্ণ স্থানের মধ্যে জলের পাইপের ন্যায় হাওয়া বলয়রূপে প্রবাহিত হয় ।

জীবনচক্রঃ জেট বায়ু – র সরলরৈখিক প্রবাহ থেকে আঁকাবাঁকা সর্পিলাকার প্রবাহে রূপান্তর অবধি নির্দিষ্ট সময়টিকে (৪-৬ সপ্তাহ) ইনডেক্স সাইকেল (Index Cycle) বলা হয় । জেট বায়ুপ্রবাহের উৎপত্তি থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত এই ইনডেক্স সাইকেল (Index Cycle) তথা জীবনচক্রকে মোট চারটি পর্যায়ে বিভক্ত করা হয় । যথা –
ক) প্রথম পর্যায়ঃ জেট বায়ুপ্রবাহের জীবনচক্রের প্রথম পর্যায়টি হাই জোনাল ইনডেক্স (High Zonal Index) নামে পরিচিত, কারণ এই পর্যায়ে জেট বায়ুর গতিবেগ খুবই বেশী থাকে । এই সময় উত্তর-দক্ষিণে বায়ুচাপের ঢাল খুব বেশী হয় । নিম্ন অক্ষাংশ ও উচ্চ অক্ষাংশের মধ্যে বায়ুপুঞ্জের বিনিময় প্রায় হয়ই না । জেট বায়ু মেরু অঞ্চলের নিকটবর্তী অংশে অবস্থান করে এবং পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হতে থাকে । এর উত্তরে শীতল মেরু বায়ু ও দক্ষিণে মৃদু ঊষ্ণ বায়ু বিরাজ করে ।
খ) দ্বিতীয় পর্যায়ঃ দ্বিতীয় পর্যায়ে জেট বায়ুর গতিবেগ ১৫০-২৫০ কিলোমিটার / ঘন্টা হয়ে থাকে । জেট বায়ু রসবি তরঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে নিরক্ষরেখার দিকে সম্প্রসারিত হতে থাকে । ফলস্বরূপ, পূর্বোক্ত শীতল বায়ু দক্ষিণে ও ঊষ্ণ বায়ু উত্তরে স্থানান্তরিত হতে থাকে ।
গ) তৃতীয় পর্যায়ঃ এই পর্যায়ে জেট বায়ুর গতিবেগ ২৫০-২২০ কিলোমিটার / ঘন্টা হয়ে থাকে । জেট বায়ুর বক্রতা আরও বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় নিরক্ষরেখার নিকটবর্তী হয়ে পড়ে । ফলস্বরূপ, পূর্বোক্ত শীতল বায়ু ক্রমশঃ আরও দক্ষিণে ও ঊষ্ণ বায়ু আরও উত্তরে স্থানান্তরিত হতে থাকে । তাপীয় অবক্রম পূর্ব থেকে পশ্চিমে হয় এবং ৩/৬ টি রসবি তরঙ্গ পৃথিবীকে বেষ্টন করে ।
এবং
ঘ) চতুর্থ পর্যায়ঃ জেট বায়ুর জীবনচক্রের এই চতুর্থ পর্যায়টি লো জোনাল ইনডেক্স (Low Zonal Index) নামে পরিচিত, কারণ এই পর্যায়ে জেট বায়ুর গতিবেগ একদমই কমে যায় । এটি জেট বায়ুর জীবনচক্রের শেষ পর্যায় । এই পর্যায়ে জেট বায়ুর তরঙ্গের বক্রতা আরও বৃদ্ধি পেয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছোটো ছোটো কক্ষ গঠন করে । কক্ষ গঠনের ফলে শীতল মেরু বায়ু মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ক্রান্তীয় অঞ্চলে ঊষ্ণ হালকা বায়ু দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে অবস্থান করে এবং অন্যদিকে উষ্ণ ক্রান্তীয় বায়ু মেরু অঞ্চলে শীতল বায়ু দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে অবস্থান করতে থাকে । ক্রমশঃ বিচ্ছিন্ন কক্ষগুলি গঠনের মধ্য দিয়ে গতিবেগ হ্রাস পেতে পেতে এই পর্যায়ের শেষভাগে জেট বায়ুর জীবনচক্রের পরিসমাপ্তি ঘটে ।

“জেট বায়ু কি?”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করা বন্ধ রয়েছে।