ভারতে জলসেচের গুরুত্ব লেখ।

ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর দেশ ভারত । তাই স্বাভাবিকভাবেই ভারতে জলসেচের গুরুত্ব তাৎপর্যপূর্ণ । নিচে ভারতে জলসেচের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হল  –
১. অনিশ্চিত মৌসুমি বৃষ্টিপাতঃ ভারত মৌসুমি জলবায়ুর দেশ । কিন্তু মৌসুমি বায়ুর প্রভাবাধীন অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তা প্রত্যেকবার নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায় না । পাশাপাশি প্রত্যেকবারই বৃষ্টিপাতের পরিমাণেরও তারতম্য দেখা যায় । কোনও বছর অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে যেমন বন্যার প্রকোপ দেখা যায় , তেমনই কোনও বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে খরা । তাই স্বাভাবিকভাবেই কৃষি প্রয়োজনে বৃষ্টিপাতের বিকল্প হিসাবে জলসেচ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায় ।

২. বৃষ্টিপাতের অসম বণ্টনঃ
ভারতবর্ষের প্রায় ৮০ % বৃষ্টিপাত মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সংঘটিত হলেও ভারতের সর্বত্র এই বৃষ্টিপাতের বন্টনের পরিমাণ সমান নয় । উত্তর পশ্চিম ভারত ও দাক্ষিণাত্য মালভূমির মধ্যভাগে গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম । যে কারণে এই সকল কম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে কৃষিকাজের জন্য জলসেচ অত্যন্ত প্রয়ােজনীয় হয়ে পড়েছে ।

৩. শীতকালীন বৃষ্টিপাতের অভাবঃ আর্দ্র গ্রীষ্মকাল ও শুষ্ক শীতকাল ভারতের জলবায়ুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য । কেবলমাত্র উত্তর পশ্চিমে ভারতের কিছু অংশ ও তামিলনাড়ুর করমণ্ডল উপকূল ছাড়া সারা ভারতের আর কোথাও তেমন উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয় না । তাই শীতকালীন রবিশস্য চাষ করার জন্য জলসেচের প্রয়ােজন অপরিহার্য হয়ে থাকে । 

৪. মৃত্তিকার জলধারণ ক্ষমতাঃ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের মৃত্তিকা দেখা যায় । এই ভিন্ন ভিন্ন মৃত্তিকার জলধারণ ক্ষমতাও ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির । এঁটেল মাটির জলধারণ ক্ষমতা বেশি হলেও লােহিত মৃত্তিকা , ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা , দোআঁশ মৃত্তিকার জলধারণ ক্ষমতা কম । এই সব কম জলধারণ ক্ষমতাযুক্ত মৃত্তিকায় কৃষিকাজ করার জন্য জলসেচ অত্যন্ত প্রয়ােজন হয়ে পড়ে ।

৫. উচ্চফলনশীল বীজ প্রয়োগঃ অধিক কৃষিফসল উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন অংশে উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহার করা হয় । এইসকল উচ্চফলনশীল বীজ চাষে প্রচুর জলের প্রয়ােজন হয় , যার সিংহভাগই জলসেচ দ্বারা মেটানো হয় ।

৬. বহুফসলী কৃষিঃ কৃষিফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য একই জমিতে আধুনিক কৃষি পদ্ধতিতে বছরে বহু ফসল ফলানাে হচ্ছে । সারা বছর জুড়ে এই বহুফসলী কৃষি পরিচালনার জন্য জলসেচের প্রয়োজন অবসম্ভাবী হয়ে পড়েছে ।

৭. শস্যের জল চাহিদাঃ আঞ্চলিক ভিন্নতার কারণে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের শস্য চাষ করা হয় । গম , জোয়ার , বাজরা , রাগি প্রভৃতি ফসলের ক্ষেত্রে জলের চাহিদা যেমন কম , তেমনই আবার ধান , পাট প্রভৃতি ফসলের ক্ষেত্রে জলের চাহিদা যেমন বেশি। যে সমস্ত ফসলের ক্ষেত্রে জলের চাহিদা বেশি সেগুলির জন্য জলসেচের প্রয়ােজন আবশ্যিক হয়ে পড়ে ।

৮. বাষ্পীভবনের আধিক্যঃ অত্যাধিক উষ্ণতাজনিত কারণে ভারতে বাষ্পীভবনের হার বেশি । ফলে শীত ঋতুতে ভারতের জলভাগে ( নদী , খাল , বিল , পুকুর , জলাশয় ) জলের পরিমাণ অনেক কমে যায় । এইসময় বর্ষার জলে পুষ্ট নদীগুলি প্রায় শুকিয়ে যায় বললেই চলে , যে কারণে কৃষিকার্যের জন্য জলসেচের প্রয়োজন হয়ে পড়ে ।

৯. উদ্যান কৃষি পরিচালনাঃ উদ্যান কৃষি মূলত পাশ্চাত্য দেশগুলিতে প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থা হলেও  বর্তমানে ভারতেও বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিচালিত হচ্ছে । এই কৃষি পদ্ধতিতে বাজারের চাহিদা পূরণের জন্য বাণিজ্যিকভাবে সারাবছর ধরে শাকসবজি , ফল , ফুল চাষ করা হয় , যে কারণে সারাবছর ধরেই প্রচুর পরিমাণে জলসেচের প্রয়ােজন হতে থাকে ।