ভারতের জলসেচ ব্যবস্থার ক্রমবিবর্তন লেখ।

ভারতের জলসেচ ব্যবস্থার ক্রমবিবর্তন তথা ভারতীয় কৃষির সাফল্যের রূপরেখা নির্ভর করে আসছে উর্বর জমি এবং কৃষির প্রয়ােজনীয় জল সরবরাহের উপর । ভারতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সর্বত্র সমান নয় । এক অঞ্চল থেকে অপর অঞ্চলের মধ্যে বৃষ্টিপাতের যথেষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় । ভারতের মােট বৃষ্টিপাতের শতকরা ৭৫ ভাগ গ্রীষ্মকালীন দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর আগমনে ঘটে থাকে । তাই শীতকালে ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল প্রায় শুষ্ক থাকে । এই দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমীবায়ুর আগমন বা প্রত্যাগমনও প্রতি বৎসর ঠিক সময়ে হয় না । কোন বৎসর এর আগমন দেরিতে ঘটে , আবার কোন বৎসর তা নির্দিষ্ট সময়ের আগেই এসে পড়ে । আবার কোন বৎসর মৌসুমীর আগমন সময়মত হলেও মাঝখানে কিছুদিন বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে যায় এবং মৌসুমী বিলম্বে প্রত্যাগমন করে । ফলে কোন বৎসর অতিবৃষ্টি ও বন্যা , আবার কোন বৎসর অনাবৃষ্টি ও খরা দেখা দেয় । কখনও কখনও একই সঙ্গে দেশের এক অংশে বন্যা এবং অপর অংশে খরার প্রাদুর্ভাব দেখতে পাওয়া যায় । যে সকল অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যত কম , সেই সকল অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তাও তত বেশী । সুতরাং ভারতের মত কৃষিপ্রধান দেশ কৃষিকার্যের জন্য কেবল মৌসুমী বায়ুর অনিশ্চিত বৃষ্টিপাতের উপরই নির্ভর করে থাকতে পারে না । এই কারণে ভারতে কৃষিকার্যের সাফল্যের জন্য জলসেচের একান্ত প্রয়ােজন ।

ভারতে কৃষির প্রয়ােজনে জলসেচের ব্যবস্থা বহু প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে । এমনকি প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার যুগেও সিন্ধু উপত্যকায় জলসেচের দ্বারা ফসল উৎপন্ন হত । দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে কাবেরী নদীর উপর গ্র্যাণ্ড অ্যানিকাট বাঁধ দ্বিতীয় শতাব্দীতে তৈরী হয় । মুঘল আমলে পঞ্চদশ শতাব্দীতে পশ্চিম যমুনা খাল খনন করা হয়েছিল এবং যােড়শ শতাব্দীতে তুঙ্গভদ্রার খালগুলি খনন করা হয় । ইংরেজ শাসনকালেও বহু খাল খনন করা হয় । এর মধ্যে গােদাবরী – কৃষ্ণা বদ্বীপ খাল , মেত্তুর সেচ প্রকল্প , ইডেন খাল প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযােগ্য ।

স্বাধীনতালাভের পর দেশের খাদ্য সংকট সমাধানের জন্য সরকার সেচ ব্যবস্থার দ্রুত প্রসারের প্রয়ােজনীয়তার বিষয় বিশদভাবে উপলব্ধি করেন । এই কারণে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার শুরু থেকেই দেশে বিভিন্ন বহুমুখী নদী পরিকল্পনা ও সেচ প্রকল্প গৃহীত ও রূপায়িত হয়েছে । এই সকল পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশে কষিক্ষেত্রে জলসেচের ব্যবহার বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে । বর্তমানে কৃষিক্ষেত্রের মােট আয়তনের ২১% জমিতে জলসেচ করা হয় । তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয় । এই জলসেচ বৃহৎ , মাঝারি ও ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে হয়ে থাকে । বিভিন্ন পরিকল্পনাকালে ভারতে মােট ১,১২৭ টি সেচ প্রকল্প গৃহীত হয় । স্বাধীনতা লাভের সময় ভারতে সেচযুক্ত কৃমিজমির পরিমাণ ছিল প্রায় ২.২৬ কোটি হেক্টর । ১৯৮৪-৮৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এই জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৬.০৫ কোটি হেক্টরে দাড়িয়েছে । এর মধ্যে বৃহৎ ও মাঝারি সেচ প্রকল্পে ২.৫৩ কোটি হেক্টর এবং ক্ষুদ্র সেচপ্রকল্পে ৩.৫২ কোটি হেক্টর জমিতে সেচকার্য হয় । 

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে , ভারতের নদীগুলিতে জল সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১,৬৭,২৫১ কোটি ঘন মিটার । এর মধ্যে ৬৬,৬০০ কোটি ঘন মিটার জল কাজে লাগান যেতে পারে । কিন্তু এখন পর্যন্ত এই জল সম্পদের মাত্র এক তৃতীয়াংশই কাজে লাগান সম্ভব হয়েছে । সুতরাং কৃষিক্ষেত্রের উন্নতিকল্পে ভারতে জলসেচ ব্যবস্থার উন্নতি করার যথেষ্ট অবকাশ আছে ।