মহানদী পরিকল্পনা বা হীরাকুঁদ পরিকল্পনা সম্পর্কে লেখ।

পরিচিতিঃ মহানদী ওড়িশার বৃহত্তম নদী । মধ্যপ্রদেশের অমরকণ্টকের নিকট থেকে উৎপত্তি লাভ করে এই নদী তেল , ইব , মন্দ , জঙ্ক , হাঁসদেও , কাটজুড়ি প্রভৃতি বহু উপনদী ও শাখানদী বিশিষ্ট হয়েছে । দামােদরের মত এই নদীও বর্ষাকালে প্রায় প্রতি বৎসর মােহনার ব – দ্বীপ অঞ্চলকে প্রলয়ঙ্কর বন্যার দ্বারা প্লাবিত করত । এই কারণে মহানদীর ধ্বংসকারী শক্তিকে গঠনমূলক কার্যে ব্যবহার করবার জন্য মহানদী পরিকল্পনা বা হীরাকুঁদ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকালেই প্রকল্পটি রূপায়িত হয় । এই পরিকল্পনায় বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য হীরাকুঁদে মহানদীর উপর একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে । পরে টিকেরপাড়া ও নারাজে আরও দুইটি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে । হীরাকুঁদ বাঁধের পশ্চাতের জলাধার থেকে বিস্তীর্ণ কৃষিক্ষেত্রে সেচকার্যে জল ব্যবহৃত হচ্ছে এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে । পরবর্তী পর্যায়ে নারাজে একটি উইয়ার বাঁধ এবং পুরী ও কটক জেলায় জলসেচের জন্য এই বাঁধ থেকে জলসেচের জন্য খাল খনন করবার পরিকল্পনা ওড়িশা সরকার দ্বারা গৃহীত হয়েছে ।

উদ্দেশ্যঃ মহানদী পরিকল্পনা বা হীরাকুঁদ পরিকল্পনার উদ্দেশ্যগুলি হল নিম্নরূপ  –
ক) বন্যা নিয়ন্ত্রণঃ হীরাকুঁদ বাঁধ ও সম্বলপুর থেকে ১৪ কিলােমিটার পশ্চিমে মহানদীর উচ্চ অববাহিকায় হীরাকুঁদে এই বাঁধটি নির্মাণ করা হয় । হীরাকুঁদ পৃথিবীর দীর্ঘতম বাঁধ । এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,৮০১ মিটার এবং উচ্চতা প্রায় ৬০ মিটার । ১৯৫৭ খ্রীষ্টাব্দে হীরাকুঁদ বাঁধের নির্মাণকার্য শেষ হয় । এই বাঁধের পশ্চাতে যে জলাধার অবস্থিত তার জলধারণের ক্ষমতা প্রায় ৮১০ কোটি ঘন মিটার , যা দামােদরের চারটি বাঁধের সম্মিলিত ক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ । এই বাঁধ নির্মাণের ফলে মহানদীর ব – দ্বীপ অঞ্চলে বন্যার প্রকোপ বহুলাংশে কমে গেছে ।

খ) জলবিদ্যুৎ উৎপাদনঃ এই বহুমুখী প্রকল্পে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র মুলত দুটি । যথা – 
১. হীরাকুঁদ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রঃ এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪ টি ইউনিটে প্রথমে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হত । পরে একে বর্ধিত করে প্রায় ২৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন করা হয় । এই জলবিদ্যুৎ রাউরকেল্লা লৌহ ও ইস্পাত কারখানায় , হীরাকুঁদের অ্যালুমিনিয়ম কারখানায় , রাজগাংপুরের সিমেন্ট কারখানায় , ব্ৰজরাজনগরের কাগজকলে , কলিঙ্গ টিউব কারখানায় , জোড়ার ফেরােম্যাঙ্গানীজ প্ল্যান্টে , ওডিশার বস্ত্রশিল্প কেন্দ্রে  , তালচের কয়লাখনিতে এবং সম্বলপুর , আঙ্গুল , কটক , ভুবনেশ্বর , খুরদা রােড , পুরী প্রভৃতি শহরে সরবরাহ করা হয় ।
২. চিপলিমা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রঃ হীরাকুঁদ বাঁধের দক্ষিণে এই পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায়ে চিপলিমা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়িয়া উঠেছে । এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৭২ মেগাওয়াট ।

গ) জলসেচ ও খাল খননঃ হীরাকুঁদ বাঁধের পশ্চাতের জলাধার থেকে বরাগড় , সম্বলপুর ও সাসনে তিনটি প্রধান খাল কাটা হয়েছে । এই তিনটি খালের মধ্যে বরাগড় খালের মধ্য দিয়ে সর্বাপেক্ষা অধিক জল পরিবাহিত হয় । এই খাল তিনটি থেকে আবার বহু শাখাখাল বিভিন্ন দিকে বিস্তার লাভ করেছে । এর ফলে প্রথম পর্যায়ে ওড়িশায় সম্বলপুর ও বলাঙ্গীর জেলার প্রায় ২৫৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে জলসেচ করা হচ্ছে । প্রথম পর্যায়ের কাজের সাথে ওড়িশা সরকার কর্তৃক গৃহীত মহানদী ব – দ্বীপ জলসেচ প্রকল্প যুক্ত করা হয়েছে । এই প্রকল্পের ফলে কটক ও পুরী জেলার মধ্যে প্রায় ৫৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে জলসেচ করা হচ্ছে ।

উপকৃত অঞ্চলঃ মহানদী পরিকল্পনা রূপায়িত হওয়ায় সমগ্র মহানদী – উপত্যকা অঞ্চল উপকৃত হয়েছে । ওড়িশা রাজ্যে প্রচুর খনিজ ও বনজসম্পদ বিদ্যমান । এই পরিকল্পনার ফলে এই খনিজসম্পদগুলিকে কেন্দ্র করে নানারকম শিল্প গডিয়া উঠেছে । ব – দ্বীপ অঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং খাদ্যশস্যেরও উৎপাদন যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে । এই বহুমুখী নদী পরিকল্পনার ফলে প্রায় ৫৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে জলসেচ করা যাচ্ছে ।