ভাকরা নাঙ্গাল পরিকল্পনা সম্পর্কে লেখ।

পরিচিতিঃ ভারতের বিভিন্ন বহুমুখী নদী পরিকল্পনার মধ্যে ভাকরা নাঙ্গাল পরিকল্পনা সর্ববৃহৎ নদী পরিকল্পনা । পাঞ্জাব , হরিয়ানা ও রাজস্থান সরকারের মিলিত প্রচেষ্টায় এই পরিকল্পনা গৃহীত হয় । এই পরিকল্পনায় পাঞ্জাব , হরিয়ানা ও রাজস্থানের শুষ্ক অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টির দিকেও দৃষ্টি দেওয়া হয় , কারণ এই সকল রাজ্যে কয়লা বা খনিজতৈলের একান্ত অভাব লক্ষ্যনীয় । এই জলবিদ্যুৎ এই অঞ্চলে বিশেষত পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় দ্রুত শিল্পবিকাশে এবং কৃষিকার্যে যথেষ্ট সহায়তা করেছে ।

উদ্দেশ্যঃ ভাকরা নাঙ্গাল পরিকল্পনা – র উদ্দেশ্যগুলি নিম্নরূপ –
ক) বাঁধ নির্মাণঃ এই পরিকল্পনায় পাঞ্জাবের শতদ্রু নদীতে ভাকরা ও নাঙ্গাল নামক দুইটি স্থানে দুইটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে । নিচে এই দুটি বাঁধ সম্পর্কে আলোচনা করা হল –
১. ভাকরা বাঁধঃ রােপার থেকে প্রায় ৮০ কিলােমিটার উত্তরে শতদ্রু নদীর উপর প্রায় ৫১৮ মিটার দীর্ঘ এবং প্রায় ২২৬ মিটার উচ্চ এই বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছে । এটি পৃথিবীর উচ্চতম বাঁধ । ভাকরা বাঁধের পশ্চাতের জলাধারের জলধারণ ক্ষমতা ৭.৪ লক্ষ হেক্টর মিটার ।
২. নাঙ্গাল বাঁধঃ ভাকরা বাঁধের প্রায় ১৩ কিলােমিটার দক্ষিণে যেখানে শতদ্রু নদী শিবালিক পৰ্বতকে অতিক্রম করে সমভূমিতে প্রবেশ করেছে সেখানে নাঙ্গাল বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে । এই বাঁধটি প্রায় ২৮৭ মিটার দীর্ঘ এবং ২৯ মিটার উঁচু । নাঙ্গাল বাঁধের জলাধারের জলধারণ ক্ষমতা হল প্রায় ২,৯৭৬ হেক্টর মিটার ।

খ) জলবিদ্যুৎ উৎপাদনঃ এই পরিকল্পনায় ভাকরা , কোটলা ও গাঙ্গুওয়ালে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে । ভাকরা বাঁধের বামতীরের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৫ টি ৯০ মেগাওয়াট এবং ২ টি ২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ইউনিট স্থাপিত হয়েছে । নাঙ্গাল হাইডেল ক্যানেলের উপর গাঙ্গুওয়াল ও কোটলায় ২৯ মেগাওয়াট ক্ষমতাযুক্ত একটি করে ইউনিট স্থাপিত হয়েছে । পরবর্তীকালে ভাকরার দক্ষিণ তীরে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপিত হওয়ায় বিদ্যুতের মোট উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাইয়া ১,২০৪ মেগাওয়াট হয়েছে ( ভাকরা – নাগাল প্রকল্পে ৬০৪ মেগাওয়াট এবং ভাকরা দক্ষিণ তীরে বিদ্যুৎ প্রকল্পে ৬০০ মেগাওয়াট ) ।

গ) জলসেচ ও খাল খননঃ ভাকরা বাঁধ থেকে ভাকরা প্রধান খাল ও ভাকরা প্রধান শাখাখাল এবং নাঙ্গাল বাঁধ থেকে ৬৪ কিলােমিটার দীর্ঘ একটি সুড়ঙ্গখাল কাটা হয়েছে । এই পরিকল্পনায় মােট প্রায় ১,১০০ কিঃ মিঃ খাল ও ৩,৪০০ কিঃ মিঃ শাখাখাল কাটা হয়েছে । খালদুটির মাধ্যমে পাঞ্জাব , হরিয়ানা ও রাজস্থানের কৃষিক্ষেত্রে সেচের জল নিয়ে যাওয়া হয় । এই খালগুলি প্রায় ২৭.৪ লক্ষ হেক্টর এলাকায় বিস্তৃত । এই খাল মাধ্যমে বর্তমানে ১৪.৬ লক্ষ হেক্টর কৃষিজমিতে জলসেচ করা সম্ভব হয়েছে ।

উপকৃত অঞ্চলঃ এই পরিকল্পনার ফলে সামগ্রিকভাবে পাঞ্জাব , হরিয়ানা ও রাজস্থান বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছে । এই সকল অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে কৃষির উল্লেখযােগ্য অগ্রগতি হয়েছে । খাদ্যশস্য , তুলা , ইক্ষু , তৈলবীজ প্রভৃতির উৎপাদন যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে । এই পরিকল্পনায় যে জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে তা বিভিন্ন শিল্পকর্মে , সেচকার্যে , বৈদ্যুতিক নলকূপ থেজে জল তুলতে এবং পল্লী অঞ্চলে বিদ্যুৎসংযোগ কার্যে ব্যবহার করা হয় । কেবল পাঞ্জাব , হরিয়ানা ও রাজস্থানেই নয় , এই বিদ্যুৎ সুদূর দিল্লী অঞ্চলেও সরবরাহ করা হয় । এই পরিকল্পনার ফলে এই অঞ্চলের কৃষিক্ষেত্রের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পক্ষেত্রেও যথেষ্ট উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছে ।