ময়ুরাক্ষী পরিকল্পনা সম্পর্কে লেখ।

পরিচিতিঃ ময়ূরাক্ষী পরিকল্পনাটি বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে একটি উল্লেখযােগ্য বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা । ময়ূরাক্ষী নদী বিহারের সাঁওতাল পরগণা জেলায় দেওঘরের নিকটস্থ ত্রিকূট পাহাড় থেকে উৎপত্তি লাভ করে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম এবং পরে মুর্শিদাবাদ জেলার মধ্য দিয়ে প্রায় ২৪০ কিলােমিটার পথ অতিক্রম করে কাটোয়া থেকে প্রায় ২০ কিলােমিটার উত্তরে ভাগীরথী নদীতে মিলিত হয়েছে । দামােদরের মত এই নদীতেও প্রায় প্রতি বছরই বন্যা হত , যার ফলে মুর্শিদাবাদ , বর্ধমান ও বীরভূম জেলার প্রচণ্ড ক্ষতি হত । এই কারণে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকালেই ময়ুরাক্ষী নদী পরিকল্পনা গৃহীত হয় ।

উদ্দেশ্যঃ এই পরিকল্পনা অনুসারে বিহারে ম্যাসাঞ্জোরে ময়ুরাক্ষী নদীর উপর একটি বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র , সিউড়ীর নিকট তিলপাড়ায় একটি সেচবাঁধ বা ব্যারেজ নির্মাণ এবং তিলপাড়া ব্যারেজ থেকে বিভিন্ন সেচখাল খনন করা হয়েছে । নিচে এগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল –
ক) বন্যা নিয়ন্ত্রণঃ বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ম্যাসাঞ্জোরে ময়ূরাক্ষী নদীর উপর যে বাঁধটি নির্মাণ করা হয় , তা কানাডা বাঁধ নামে পরিচিত । ১৯৫৫ খ্রীষ্টাব্দে কানাডা সরকারের সহযােগিতায় এই বাঁধটি নির্মিত হয় বলে একে কানাডা বাঁধ বলা হয় । এই বাঁধটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৫১ মিটার এবং উচ্চতা প্রায় ৪৭ মিটার ।
খ) জলবিদ্যুৎ উৎপাদনঃ ম্যাসাঞ্জোর জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কানাডা বাঁধের ঠিক নীচে একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে । এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা খুবই সামান্য । এখানকার দুটি ইউনিটে ( প্রতিটি ২ মেগাওয়াট ক্ষমতাযুক্ত ) বর্ষার সময় দৈনিক ৪ মেগাওয়াট এবং বৎসরের অন্যান্য সময়ে মাত্র ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় ।
গ) জলসেচঃ জলসেচ ব্যবস্থার জন্য সিউড়ীর নিকট ময়ূরাক্ষী নদীর উপর তিলপাড়া ব্যারেজটি ১৯৫১ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত হয় । এই সেচবাঁধটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০৪ মিটার এবং এটি প্রায় ২৯ লক্ষ কিউসেক জল সেচের জন্য সরবরাহ করতে পারে । বিহারের সামান্য অংশে ( মাত্র ৯,৩০৮ হেক্টর জমিতে ) কানাডা বাঁধ থেকে খাল মাধ্যমে জলসেচ করা হয় । তিলপাড়া ব্যারেজ থেকে সেচকার্যের জন্য কৃষিক্ষেত্রে জল পৌছে দিতে ব্যারেজের দুই তীরে দুটি প্রধান খাল কাটা হয়েছে । এই খাল দুটির প্রতিটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ১১২ কিলােমিটার । খাল দুটি থেকে বহু শাখাখাল বিভিন্নদিকে বিস্তার লাভ করেছে । উত্তরের অংশে প্রধান খালটিতে দ্বারকা ও ব্রাহ্মণী নদীতে দুইটি ছােট ব্যারেজ এবং দক্ষিণের প্রধান খালটিতে কোপাই ও বক্রেশ্বরে দুটি ছােট ব্যারেজ এবং চন্দ্রভাগা অ্যাকুইডাক্ট নির্মিত হয়েছে । এছাড়া জল নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন শাখাখালে রেগুলেটর , অ্যাকুইডাক্ট প্রভৃতি নির্মাণ করা হয়েছে । সমগ্র পরিকল্পনার দ্বারা প্রায় ২৫১ লক্ষ হেক্টর জমিতে জলসেচ হয় ।

উপকৃত অঞ্চলঃ ময়ূরাক্ষী পরিকল্পনায় বিহারের সাঁওতাল পরগণার কিছু অংশে জলসেচ এবং পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম ও মুর্শিদাবাদ জেলার কম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে কৃষিকার্যে সেচ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে । এই সেচ ব্যবস্থার প্রবর্তনে খাদ্যশস্যের উৎপাদনও যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে । ম্যাসাঞ্জোর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে যে সামান্য বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় , তা দুমকা এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে চাল কল ও বিভিন্ন কুটির শিল্পে ব্যবহৃত হয় । এছাড়াও কানাডা বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর নিম্ন অববাহিকায় বিশেষত মুর্শিদাবাদ জেলায় বন্যার প্রকোপ বহুলাংশে কমে গেছে ।