হিমালয়ের নদীবিন্যাসের ক্রমবিবর্তন লেখ।

হিমালয় সম্পর্কে জানার শুরুতেই এই উল্লেখযোগ্য পর্বতমালার নদীগুলিও ভূ – বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে । বিশেষতঃ তিব্বত মালভূমিতে উৎপন্ন সিন্ধু , সাংপাে ও শতদ্রু এই তিনটি নদীই এখানে প্রধান তাৎপর্যপূর্ণ । যদিও এই নদীগুলি ছাড়া আরও অন্যান্য নদী সুউচ্চ ও বহু শিখরমণ্ডিত পর্বতমালাকে অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে । নিচে হিমালয়ের নদীবিন্যাসের ক্রমবিবর্তন সম্পর্কে আলোচনা করা হল –

১১১১ খ্রীষ্টাব্দে E. H. Pasco ও C. E. Pilgrim হিমালয়ের নদীবিন্যাসের ক্রম বিবর্তনের একটি সুচিন্তিত মতবাদ প্রকাশ করেন । এই মতবাদে আলােচনার মূল বিষয় হল বালুকা , নুড়ি ও প্রস্তরখণ্ডের বিশাল গভীরতা , যার দ্বারা শিবালিক পর্বত গঠিত হয়েছে । পলিশঙ্কুতে ব্যাপক আকারে বাহিত পদার্থের সঞ্চয়কে এর কারণ হিসাবে ধরা হয়েছে । এই পদার্থসমূহ হিমালয় থেকে ক্ষয়িত ও নদী দ্বারা বাহিত হয়ে হিমালয়ের পাদদেশ অঞ্চলকে গঠিত করেছে ।

Pasco ও Pilgrim- এর মতে , এই সঞ্চয় ঘটেছিল একটি বৃহৎ নদী উপত্যকায় — যে নদীটি Pasco – র “ সিন্ধু – ব্ৰহ্মপুত্ৰ ” এবং Pilgrim – এর “ শিবালিক ” নদী , যা হিমালয় এবং গণ্ডোয়ানাল্যাণ্ডের মধ্য দিয়ে উত্তর – পশ্চিমে প্রবাহিত ছিল । এই গণ্ডোয়ানাল্যাণ্ড আরাবল্লী পর্বতরেখা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । পরে বহিঃহিমালয়ের পাদদেশ সম্প্রসারণের ফলে এটি দক্ষিণে সরে যায় । উত্তর থেকে আগত প্রধান নদীটির উপনদীগুলি সক্রিয়ভাবে সঞ্চয়কার্যে অংশ নেয় এবং স্পষ্টতই নিম্ন যমুনা ও গঙ্গাকে উপদ্বীপের উত্তর পার্শ্বে সরে যেতে হয় । নদীটি সিন্ধু রেখা বরাবর তবে আরও পশ্চিমে আরব সাগরে গিয়ে পড়ে । এয়ােসিন ( Eocene ) যুগে নিম্ন সিন্ধু – অববাহিকা অঞ্চল সিন্ধু উপসাগরের দ্বারা অধিকৃত ছিল , যা পরবর্তীকালে নদীবাহিত পদার্থসমূহ দ্বারা ভরাট হয়ে গেছে । Pilgrim বলেন , কাংড়া ও ভূটানে উর্দ্ধ শিবালিকে ক্ষুদ্র প্রস্তরখণ্ড সঞ্চয়ের গভীরতা নদীগুলির একদা উত্তর – পশ্চিমে প্রবাহকে নির্দেশ করে ।

বিশাল উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বের বিস্তার রাজমহল পাহাড় ও শিলং মালভূমির পলল আস্তরণ দ্বারা নির্ণয় করা সম্ভব হয় । Pilgrim মনে করেন , উপদ্বীপ অঞ্চলটি তখন বঙ্গোপসাগরের অধিকাংশে প্রসারিত ছিল । মহানদীর প্রশস্ততাও বর্তমান অপেক্ষা এর পূর্বেকার অধিকতর দৈর্ঘ্যকেই নির্দেশ করে । স্থানান্তরজনিত বর্তমান নদী – বিন্যাসের কারণ হিসাবে Pilgrim ব্যাখ্যা করেছেন যে , ভূ – আন্দোলন দ্বারা কাংড়ার উত্তর পশ্চিমে শিবালিক নদীর গতিপথ রুদ্ধ হয় , যার ফলে রাজমহল ও শিলং জলবিভাজিকা থেকে দক্ষিণবাহিনী শক্তিশালী নদীর ক্ষয়কার্য পশ্চাৎদিকে অগ্রসর হয় এবং উত্তর পশ্চিমে ভূ – উত্থানের ফলেও নদী – বিন্যাসটি বর্তমান গঙ্গা – ব্রহ্মপুত্র ব – দ্বীপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । বঙ্গোপসাগরের তলদেশ বসে গেলে পুনর্যৌবন সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে । তাই Evan ও Oldham বলেছেন যে , ভূ – আন্দোলনই পূর্বেকার নদী – বিন্যাসের পরিবর্তনের অধিকতর সম্ভাবনাময় কারণ ।

সিন্ধু – গঙ্গা সমভূমির উত্তর পার্শ্বে অনেক নদীতেই উত্তর – পশ্চিমদিক নির্দেশক সুস্পষ্ট V – আকৃতি লক্ষ্য করা যায় । এইগুলির অবস্থান সাধারণভাবে শিবালিক পলল সীমানায় । এই V – গুলির উত্তর সীমান্তগুলি Pasco- র মতে Indo – Brahm – এর পুরোনো দক্ষিণপার্শ্বস্থ উপনদীসমূহের সাক্ষ্যবাহী , যা শিবালিক পাহাড়ের উত্থানের ফলে বর্তমানে আরও সুস্পষ্ট ও স্থায়ী হইয়াছে । Indo Brahm – এর মধ্যভাগ নিম্ন Indo Brahm – এর বামপার্শ্বস্থ উপনদীগুলি দ্বারা দক্ষিণ – পশ্চিম দিক থেকে এবং দক্ষিণ – পূর্ব দিক থেকে এটি গঙ্গার উর্ধপ্রবাহের উপনদী দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছে । পটওয়ার মালভূমি যে ভূ – আন্দোলনে উখিত হয়েছে ঐ একই আন্দোলনে গঙ্গার এই উপনদীগুলি পুনর্যৌবন লাভ করে থাকতে পারে । এই সময় পূর্ব পার্শ্বে রাজমহল – শিলং জলবিভাজিকাটিকে বিচ্ছিন্ন করে গঙ্গা – ব্রহ্মপুত্র নদী দুইটি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে । এটি অবশ্য কিছুটা পুনর্যৌবনকেই নির্দেশ করে । পশ্চিমপার্শ্বস্থ শক্তি প্রবল উর্ধপ্রবাহে ক্রমশঃ গঙ্গা – যমুনা এলাকায় Indo Brahm – এর দক্ষিণপার্শ্বস্থ উপনদীগুলিকে অধিকার করে নেয় । Pasco পেমাকাই হইতে গিলগিট পর্যন্ত প্রবাহিত একটি বৃহৎ তিব্বতী নদীর উল্লেখ করেছেন । Pasco- র মতে , এই আদি তিব্বতীয় নদীটি ওক্সাসে প্রবাহিত হয়ে থাকতে পারে অথবা ফুটোপাস কিংবা কারনালি , শতদ্রু বা উর্ব সিন্ধু নদ দ্বারা সমভূমিতে নেমে থাকতে পারে । Pasco মনে করেন , এই প্রাথমিক তিব্বতীয় নদীটি পরে ইরাবতী , চেন্দুইন , মেঘনা , কালী , গণ্ডক , শতদ্রু ও সিন্ধু নদের দ্বারা বিভক্ত হয় ।

কিন্তু Annadale এবং De Terra উপরােক্ত মতের সমালােচনা করেন । Annadale মনে করেন , উপদ্বীপ ও অবশিষ্ট ভারতবর্ষের মধ্যে একটি দীর্ঘ অবনমিত অঞ্চল অথবা প্রণালী ছিল , যা ক্রমশ সংকীর্ণ হতে থাকে এবং অবশেষে হিমালয়ের গঠন অগ্রসর হলে এটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে বর্তমানের বিন্যাসপ্রাপ্ত হয় । Annadale- এর পর De Terra ১৯৩৪-৩৫ খ্রীষ্টাব্দে এই সমস্যাটির পুনর্বিশ্লেষণ করেন । তিনি মনে করেন যে , এটি পূর্ববর্তী বিন্যাস ( Antecedent system ) – এর পর্যায়ে পড়ে । শতদ্রুকে Pasco তিব্বতীয় নদীটির একটি অধিকৃত অংশ হিসাবে মনে করেছেন । Davis মনে করেন শতদ্রু হল হিমালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলির মধ্যে কনিষ্ঠতম এবং প্রাচীন গণ্ডোয়ানা চ্যুতিরেখা বরাবর প্রধান হিমালয় বসে গেলে এর সৃষ্টি হয় ।