ভারতের হ্রদের শ্রেণীবিভাগ কর।

ভারতের হ্রদের শ্রেণীবিভাগ মূলত দুই প্রকার । যথা – ক) উৎপত্তি অনুসারে ও খ) প্রকৃতি অনুসারে । নিচে এদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল –
ক) উৎপত্তি অনুসারে হ্রদের শ্রেণীবিভাগঃ উৎপত্তি অনুসারে ভারতের হ্রদগুলি মুলত সাত প্রকার । যথা –

১. নদী দ্বারা সৃষ্ট হ্রদঃ নিম্নগতিতে নদী আঁকাবাঁকা পথে অগ্রসর হয়ে ঘােড়ার ক্ষুরের আকার নিয়ে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ সৃষ্টি করে ।
উদাহরণ – পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গা নদীর তীরে এরূপ হ্রদ দেখা যায় ।

২. হিমবাহ দ্বারা সৃষ্ট হ্রদঃ হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট করি বা সার্ক হ্রদ সৃষ্টি করে এবং হিমবাহ উপত্যকাতেও অনেক সময় যে গহ্বর সৃষ্টি হয় , তাতে জল জমে হ্রদ সৃষ্টি করে ।
উদাহরণ – হিমালয়ের বাসুকিতাল , রূপকুণ্ড , হেমকুণ্ড প্রভৃতি হ্রদ ।

৩. ভূ – আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট হ্রদঃ ভূ – আলােড়নের ফলে জলাভূমির চারপাশের অংশ উঁচু হয়ে গিয়ে মাঝে হ্রদ সৃষ্টি করে ।
উদাহরণ – অসমের নওঙ্গা ইয়াঙ্গা হ্রদটি এভাবে সৃষ্টি হয়েছে ।

৪. বায়ুর ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট হ্রদঃ মরু অঞ্চলে বায়ুর ক্ষয়কার্যের ফলে ভূপৃষ্ঠে যে গর্তের সৃষ্টি হয় তা ভূগর্ভস্থ জলের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে লবণাক্ত হ্রদ সৃষ্টি করে । রাজস্থানে এদের ধান্দ ( Dhand )  বলে ।

৫. সঞ্চয়কার্যের ফলে সৃষ্ট হ্রদঃ সঞ্চয়কার্যের ফলে সৃষ্ট হ্রদগুলি হল –
( i ) বদ্বীপ অঞ্চলে নদীবাহিত পলি জলের চারদিকে জমে ব-দ্বীপ হ্রদ সৃষ্টি করে । উদাহরণ – সুন্দরবনের ব-দ্বীপ হ্রদ ।
( ii ) দুটি ব-দ্বীপের মাঝে হ্রদ গঠিত হতে পারে । উদাহরণ – কোলেরু হ্রদ ( অন্ধ্রপ্রদেশ ) ।
( ii ) সমুদ্রের মাঝখানে অবস্থিত প্রবাল বলয় , তার মধ্যভাগে অনেক সময় অগভীর প্রবাল হ্রদ সৃষ্টি হয় । উদাহরণ – লাক্ষাদ্বীপে এরূপ হ্রদ দেখতে পাওয়া যায় ।
( iv ) উপকূলের সমান্তরালে থাকা বাঁধ কোনাে কারণে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়ে বাঁধের পশ্চাতে জলাশয় সৃষ্টি করে , যা উপহ্রদ ( Lagoon ) নামে পরিচিত । উদাহরণ – চিল্কা ও পুলিকট । কেরালায় এদের কয়াল বলে । উদাহরণ – অষ্টমুদি কয়াল ।

৬. উল্কাপাতের ফলে সৃষ্ট হ্রদঃ বিশাল আকৃতির উল্কা ভূপৃষ্ঠে পড়ে যে গর্তের সৃষ্টি করে , তাতে পরবর্তীকালে জল জমে এরূপ হ্রদ সৃষ্টি করে । উদাহরণ – মহারাষ্ট্রের লােনা হ্রদ ।

৭. মনুষ্যসৃষ্ট কৃত্রিম হ্রদঃ বন্যা নিয়ন্ত্রণ , সেচকার্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মনুষ্য নির্মিত জলাধারকে কৃত্রিম হ্রদ বলে ।
উদাহরণ – গােবিন্দ সাগর , পুষ্কর হ্রদ ( আজমের জেলা ) , সুখনা হ্রদ ( চণ্ডীগড় ) , হিমায়ুত সাগর ও ওসমান সাগর ( হায়দরাবাদ শহর ) নর্মদা নদীর ওপর নির্মিত তাওয়া জলাশয় উল্লেখযােগ্য ।

খ) প্রকৃতি অনুসারে হ্রদের শ্রেণীবিভাগঃ প্রকৃতি অনুসারে ভারতের হ্রদগুলিকে মুলত তিন ভাগে ভাগ করা যায় । যথা –

১. লবনাক্ত জলের হ্রদঃ যে সকল হ্রদে উপস্থিত জলের প্রকৃতি লবনাক্ত হয়,তাদের লবনাক্ত জলের হ্রদ বলা হয় ।
উদাহরণ – ওড়িশা উপকূলের চিলকা ( ভারতের বৃহত্তম উপহ্রদ ) ; রাজস্থানের জয়পুরের সম্বর  ( ভারতের বৃহত্তম লবনাক্ত জলের হ্রদ ) ; অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ু সীমান্তে পুলিকট ; কেরালায় ভেম্বানাদ ( ভারতের বৃহত্তম কয়াল ) ও অষ্টমুদি ; জম্মু – কাশ্মীরের লাদাখের প্যাংগং ( পৃথিবীর উচ্চতম লবনাক্ত জলের হ্রদ ) ; তামিলনাড়ুর কালিভেলি প্রভৃতি ।

২. স্বাদু জলের হ্রদঃ যে সকল হ্রদের জল স্বাদু অর্থাৎ মিষ্টি প্রকৃতির , তাদের স্বাদু জলের হ্রদ বলা হয় ।
উদাহরণঃ অন্ধ্রপ্রদেশের কোলেরু ( ভারতের বৃহত্তম স্বাদু জলের হ্রদ ) ; উত্তরাখন্ডের ভীমতাল , সাততাল , রূপকুন্ড ; হিমাচল প্রদেশের চন্দ্রতাল , সুরজতাল , রেণুকা ; কাশ্মীর উপত্যকার ডাল , উলার ; মণিপুরের লোকটাক ( উত্তর – পূর্ব ভারতের বৃহত্তম হ্রদ ) , তামিলনাড়ুর ভীরানাম , সিকিমের সাংমো , মধ্যপ্রদেশের ভোজ ( ভারতের সর্বাধিক দূষিত হ্রদ ) প্রভৃতি ।

৩. কৃত্রিম হ্রদঃ প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি না হয়ে যে সকল হ্রদ মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে সৃষ্টি করে , তাদের কৃত্রিম হ্রদ বলে ।
উদাহরণ – রাজস্থানের আজমেরের পুষ্কর , চন্ডীগড়ের সুখনা , হায়দরাবাদের ওসমান সাগর প্রভৃতি ।