উত্তর ভারতের নদ নদী সম্পর্কে লেখ।

ভারত একটি নদীমাতৃক দেশ । বহু প্রাচীনকাল থেকেই এই সকল নদ – নদীর তীরে ভারতীয় সভ্যতা , সংস্কৃতি ও কৃষ্টির বিকাশ ঘটেছিল । দেশের বিভিন্ন অঞ্চল দিয়ে বহু নদ – নদী প্রবাহিত এবং এদের চরিত্রও বিভিন্ন ধরনের । উত্তরে হিমালয় অঞ্চল থেকে আসা নদীগুলি বরফগলা জলে পুষ্ট বলে সারাবছরই প্রবাহিত হয় । কিন্তু উপদ্বীপ অঞ্চলের নদীগুলি কেবল বৃষ্টির জলে পুষ্ট হওয়ায় , বর্ষা ভিন্ন অন্য সময় প্রায় শুষ্ক থাকে । পশ্চিমে রাজস্থানের শুষ্ক মরু অঞ্চলে এমন বহু নদী আছে যাদের বৃষ্টি ভিন্ন অন্য সময় কোন অস্তিত্বই থাকে না । ভারতের নদ – নদীগুলিকে প্রধানত দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায় । যথা – ক) উত্তর ভারতের নদ – নদী এবং খ) দক্ষিণ ভারতের নদ – নদী । নিচে উত্তর ভারতের নদ নদী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল –

উত্তর ভারতের নদ – নদীঃ
এই অঞ্চলের নদীগুলির মধ্যে সিন্ধু , গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র এই তিনটি নদীই প্রধান । এই সকল নদী আবার উপনদী ও শাখানদীর সমন্বয়ে ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে । নিম্নে এদের বিবরণ দেওয়া হল ।

সিন্ধুঃ সিন্ধুনদ তিব্বতের মানস সরােবর হ্রদের ১০০ কিঃ মিঃ উত্তরে কতকগুলি প্রস্রবণ থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণ – পূর্ব থেকে উত্তর – পশ্চিমে তিব্বতে ২৫০ কিঃ মিঃ পথ অতিক্রম করে ভারতে কাশ্মীর রাজ্যে প্রবেশ করেছে । কাশ্মীরে সিন্ধু দক্ষিণ পূর্ব থেকে উত্তর – পশ্চিমে ৫৬০ কিঃ মিঃ পথ গভীর উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বুঞ্জির নিকট গভীর খাঁত কেটে ( ৫,২০০ মিঃ গভীর ) দক্ষিণে বাঁক নিয়ে পুনরায় ৯০ কিঃ মিঃ পথ অতিক্রম করে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে এবং অবশেষে দক্ষিণ – পশ্চিমে প্রবাহিত হয়ে আরবসাগরে পতিত হয়েছে । ভারতে সিন্ধুর মােট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭০৯ কিঃ মিঃ এবং এর অধিকাংশই পার্বত্য অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এই উপত্যকায় জনবসতি খুব কম এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনুন্নত ।
উপনদীঃ সিন্ধুর সাথে বহু উপনদী এসে মিলিত হয়েছে । এর মধ্যে ঝিলাম , চন্দ্রভাগা , ইরাবতী , বিপাশা ও শতদ্রু এই পাঁচটি নদী বিশেষ উল্লেখযােগ্য । এই পঞ্চনদের সবগুলিই পশ্চিম হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে কিছুটা পথ ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে । সিন্ধুর সর্বাপেক্ষা উল্লেখযােগ্য উপনদী শতদ্রু ৫,০০০ মিটার উচ্চতায় তিব্বতের সমভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে রােপারের নিকট পাঞ্জাব সমভূমিতে প্রবেশ করেছে । পার্বত্য – অংশে শতদ্রুর উপত্যকা অতি সংকীর্ণ ও গভীর । শতদ্রু নদীতে ভারার নিকট বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে । ভারতে শতদ্রুর দৈর্ঘ্য ১,০৫০ কিঃ মিঃ ।
তীরবর্তী শহরঃ বিপাশা নদীর তীরে মানালি, বিতস্তা নদীর তীরে শ্রীনগর, শতদ্রু নদীর তীরে ভাকরা প্রভৃতি সিন্ধু নদের বিভিন্ন উপনদীর তীরবর্তী বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য শহর।

গঙ্গাঃ ভারতের সর্বপ্রধান নদী গঙ্গা , হিন্দুদের নিকট অতি পবিত্র নদীরূপে পরিগণিত হয়ে থাকে । এর গতিপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫০০ কিমি ।  উত্তরপ্রদেশে হিমালয়ের ( উত্তরাখণ্ড ) উচ্চ পার্বত্য অংশে ৬,৬০০ মিঃ উচ্চতায় গােমুখ বা গঙ্গোত্রী নামক হিমবাহ থেকে উৎপন্ন ভাগীরথী ( যা গঙ্গা নামেও পরিচিত ) এবং বদ্রীনাথের উত্তরে ৭,৮০০ মিঃ উচ্চতায় অবস্থিত অলকাপুরী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন অলকানন্দা দেবপ্রয়াগে মিলিত হয় । এই দুই নদীর মিলিত প্রবাহই পরে গঙ্গা নামে প্রবাহিত । দেবপ্রয়াগের পর গঙ্গা আরও ৭০ কিমি পথ দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে নাগটিলা ও শিৰালিক পাহাড়কে ছেদ করে হরিখানের নিকট সমভূমিতে নেমেছে । হরিদ্বারের পর গঙ্গা দক্ষিণ – পূর্ব ও পূর্ববাহিনী হয়ে উত্তর প্রদেশ ও বিহারের মধ্য দিয়া ১,২০০ কিঃমিঃ পথ অতিক্রম করে দক্ষিণমুখী হয়েছে এবং রাজমহল পাহাড়ের পূর্ব দিক দিয়ে পতিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে । পশ্চিমবঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলায় ধুলিয়ানের নিকট গঙ্গা দুইটি অংশে বিভক্ত হয়েছে । একটি শাখা পদ্মা নামে দক্ষিণ – পূর্ব দিকে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অবশেষে মেঘনা নামে বঙ্গোপসাগরে এবং অপর শাখা দক্ষিণে ভাগীরথী – হুগলি নামে প্রবাহিত হয়ে সাগর দ্বীপের নিকট বঙ্গোপসাগরেই মিলিত হয়েছে । গঙ্গা এই অংশে এক বিশাল ব – দ্বীপ সৃষ্টি করেছে এবং এই ব – দ্বীপ পৃথিবীতে বৃহত্তম ।
উপনদীঃ গঙ্গার সাথে বহু উপনদী এসে মিলিত হয়েছে । গঙ্গার বামতীরে প্রথম উল্লেখযােগ্য উপনদী হল রামগঙ্গা । এলাহাবাদের ( প্রয়াগ ) নিকট গঙ্গার দক্ষিণ তীরে মিলিত হয়েছে , এর প্রধান উপনদী যমুনা । গঙ্গা ও যমুনার সঙ্গমে পলি মিশ্রিত গঙ্গার ঘােলা জল ও যমুনার স্বচ্ছ নীল জলের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে দেখা যায় । গঙ্গার দক্ষিণ তীরে অপর একটি উল্লেখযােগ্য নদী হল টোন । বারাণসীর কিছু পূর্বে গােমতী এবং পরে ঘর্ঘরা ( সরযু ) গঙ্গার বামতীরে মিলিত হয়েছে । এর কিছু পরেই মধ্য – ভারতের উচ্চভূমি থেকে আগত শােন নদী গঙ্গার দক্ষিণ তীরে এসে মিলিত হয়েছে । আরও পূর্বে গঙ্গার বামতীরে পাটনার নিকট মিলিত হয়েছে গণ্ডক । পাটনা ও রাজমহলের মধ্যবর্তী অংশে উত্তর দিক থেকে আরও তিনটি উপনদী বুড়ীগণ্ডক , বাগমতী ও কুশী ( কোশী ) গঙ্গার বামতীরে মিলিত হয়েছে । নেপাল হিমালয় থেকে আগত কুশী নদীতে বর্ষায় প্রায়ই বন্যা দেখা দেয় । দার্জিলিং হিমালয় থেকে নির্গত মহানন্দা বাংলাদেশে গঙ্গার বামতীরে মিলিত হয়েছে । মহানন্দাই গঙ্গার ( পদ্মা ) বামতীরের উল্লেখযােগ্য শেষ উপনদী । ফরাক্কার নিকট ধুলিয়ানে গঙ্গার অপর শাখা ভাগীরথী – হুগলী নামে পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে । ভাগীরথী হুগলীর দক্ষিণ তীরে পশ্চিম থেকে আসা কতকগুলি উপনদী এসে মিলিত হয়েছে । এদের মধ্যে ময়ূরাক্ষী , অজয় , দামােদর , রূপনারায়ণ ( শিলাই ও দ্বারকেশ্বরের মিলিত প্রবাহ ) , হলদি ( কাসাই ও কেলেঘাই – এর মিলিত প্রবাহ ) বিশেষ উল্লেখযােগ্য । ভাগীরথীর পূর্বতীরে বহু শাখানদী দক্ষিণে প্রবাহিত । এদের মধ্যে ভৈরব , জলঙ্গী , মাথাভাঙ্গা , চুর্ণ , গড়াই প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযােগ্য । জলঙ্গী নবদ্বীপের নিকট ভাগীরথীর বাম তীরে মিলিত হয়েছে।
তীরবর্তী শহরঃ উচ্চ , মধ্য ও নিম্নগতিতে সমগ্র পরিক্রমায় গঙ্গার মােট দৈর্ঘ্য ২,৫১০ কিলােমিটার এবং এর অববাহিকার আয়তন ৯,৫১,৬০০ বর্গ কিলােমিটার । হরিদ্বার থেকে মােহনা পর্যন্ত বিশাল অববাহিকা গঙ্গার পলিসিঞ্চনে অত্যন্ত উর্বর এবং শস্য উৎপাদনে পৃথিবীতে এক উল্লেখযােগ্য স্থান অধিকার করে । তাই গঙ্গার উভয়তীরে প্রাচীনকাল থেকে বহু জনপদ গড়ে উঠেছে । এদের মধ্যে হরিদ্বার , কানপুর , এলাহাবাদ , বারাণসী , পাটনা , মুঙ্গের , ভাগলপুর , নবদ্বীপ ও কলকাতা উল্লেখযােগ্য । যমুনা তীরের শহরগুলির মধ্যে দিল্লী , মথুরা ও আগ্রা প্রধান ।

যমুনাঃ গঙ্গার সর্বাপেক্ষা উল্লেখযােগ্য উপনদী যমুনা । এর প্রবাহপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩০০ কিমি । গঙ্গার উৎপত্তিস্থলের কিছু পশ্চিমে যমুনােত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে গঙ্গার পশ্চিমে গঙ্গার প্রায় সমান্তরালে ৬৭ কিঃ মিঃ পথ প্রবাহিত হয়ে এলাহাবাদের নিকট গঙ্গার সাথে মিলিত হয়েছে ।
উপনদীঃ মধ্য – ভারতের উচ্চভূমি থেকে আগত চম্বল , সিন্দ , বেতওয়া , ধসন ও কেন যমুনার প্রধান উপনদী ।
তীরবর্তী শহরঃ যমুনা তীরের শহরগুলির মধ্যে দিল্লী , মথুরা ও আগ্রা প্রধান ।

ব্ৰহ্মপুত্রঃ এই নদের মােট দৈর্ঘ্য ২৮৯০ কিঃ মিঃ , যার মধ্যে ভারতে এর প্রবাহপথ ৮৮৫ কিঃ মিঃ । ব্রহ্মপুত্র নদ তিব্বতের মানস সরোবর হ্রদের ১০০ কিঃ মিঃ দক্ষিণ – পূর্বে ৫,১৫০ মিঃ উচ্চতায় অবস্থিত চেমায়ুং দং নামক হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে সাংপো নামে তিব্বতের দক্ষিণ দিয়ে পূর্ব দিকে ১,৬৯৫ কিঃ মিঃ পথ প্রবাহিত হয়েছে । এর পর নামচাবারওয়ার ( Namchabarwa ) সংকীর্ণ ও গভীর গিরিখাতের মধ্য দিয়ে সাংপাে হিমালয় পর্বতকে অতিক্রম করে ডিহং নামে সাদিয়ার উত্তর প্রান্তে ভারতে প্রবেশ করেছে । এই অংশে উত্তরদিক থেকে ডিবং ও পূর্বদিক থেকে লুহিত ( Luit ) নদীদ্বয় ডিহং নদীর সাথে ব্ৰহ্মকুন্ডে মিলিত হয়েছে । তিনটি নদীর মিলিত ধারাই ব্ৰহ্মপুত্র নামে অসম উপত্যকার মধ্য দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়েছে । এই অংশে ব্রহ্মপুত্রের উল্লেখযোগ্য উপনদীগুলির মধ্যে উত্তরদিক থেকে আগত সুবনশিরি , কামেং ও মানস এবং দক্ষিণদিক থেকে আগত বুড়ি – ডিহং , ডিসাঙ , কপিলি ও ধানসিরি বিশেষ উল্লেখযােগ্য । ব্ৰহ্মপুত্ৰ অসম – উপত্যকা অতিক্রম করে গারাে পাহাড়ের পাদদেশে ধুবড়ীর নিকট দক্ষিণে বাঁক নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়েছে । অসমে ব্রহ্মপুত্র নদে প্রায়ই বন্যা দেখা দেয় । ব্রহ্মপুত্রের নদীখাতে বালি সঞ্চিত হয়ে বহু চড়ার সৃষ্টি হয়েছে । এদের মধ্যে মাজুলির বালুচর পৃথিবীতে বৃহত্তম ।
উপনদীঃ সুবনসিরি , কামেং , মানস , বুড়ি – ডিহং , ডিসাং , কপিলি , ধানসিরি প্রভৃতি হল ব্রহ্মপুত্র নদের উল্লেখযোগ্য উপনদীসমূহ ।
তীরবর্তী শহরঃ ডিব্রুগড় , তেজপুর , গৌহাটি , গোয়ালপাড়া , ধুবড়ি প্রভৃতি ব্ৰহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী উল্লেখযোগ্য শহর ।

লুনি নদীঃ লুনির প্রবাহপথের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫০ কিঃ মিঃ । রাজস্থানের একমাত্র উল্লেখযোগ্য নদী । আজমীরের দক্ষিণ – পশ্চিমে নাগপাহাড়ের নিকট আনাসাগর থেকে উৎপত্তি লাভ করে  বালতােরার নিকট হঠাৎ দক্ষিণে বাঁক নিয়ে কচ্ছের রণে পড়েছে । এই নদীর জল বিশেষত বালতােরার পর বেশ লবণাক্ত বলে এর নাম লুনি হয়েছে । বর্ষা ভিন্ন অন্য সময় লুনির জল কচ্ছের রণে পৌছাইতে পরে না ।
উপনদীঃ সুকরী ও জওয়াই লুনির দুইটি প্রধান উপনদী ।

সুবর্ণরেখা নদীঃ সুবর্ণরেখা নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৭৭ কিমি । এটি ছােটনাগপুর মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়েছে । তবে নদীটি বিহার থেকে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে ওড়িশায় প্রবেশ করে বালিয়াপালের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে । সুবর্ণরেখা নদীটিতে অনেকগুলি জলপ্রপাত আছে । এদের মধ্যে রাঁচীর কাছে হুডু জলপ্রপাতটি সর্বপ্রধান ।
এছাড়াও উত্তর ভারতের অন্যান্য নদীগুলির মধ্যে ব্রাহ্মণী ( প্রায় ৭০৫ কি.মি. ) ও বৈতরণী ( প্রায় ৩৩৩ কি.মি. ) উল্লেখযােগ্য ।