ভারতের জনজীবনে উপদ্বীপীয় মালভূমি অঞ্চলের গুরুত্ব লেখ।

ভারতের জনজীবনে উপদ্বীপীয় মালভূমি অঞ্চলের গুরুত্ব অনেকখানি । নিচে এগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল –
১. খনিজ সম্পদ আহরণঃ ভারতের মালভূমি অঞ্চল খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ । এখানে আকরিক লােহা , তামা , কয়লা , ম্যাঙ্গানিজ , চুনাপাথর , ডলােমাইট প্রভৃতি খনিজপদার্থ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় । ছােটোনাগপুর মালভূমি ভারতের খনিজ ভাণ্ডার ’ রূপে পরিচিত । এই খনিজসম্পদগুলিকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ গড়ে উঠেছে । লৌহ – আকরিক , কয়লা , বক্সাইট , ম্যাঙ্গানীজ , অভ্র , তাম্র , স্বর্ণ , চুনাপাথর , জিপসাম প্রভৃতি নানাবিধ খনিজ এই অঞ্চলে , বিশেষতঃ ছােটনাগপুর ও কর্ণাটক মালভূমি এবং দামােদর – উপত্যকায় পাওয়া যায় ।

২. কৃষির প্রসারঃ কৃষিকার্যের উপযােগী পরিবেশ এখানে বিশেষ নেই । অধিকাংশ অঞ্চল মালভূমি , উচ্চ পাহাড় ও সমপ্রায়ভূমির দ্বারা আবৃত । ফলে নদী – উপত্যকাগুলি ব্যতীত অন্যত্র কৃষিকার্য করা কষ্টকর । সমগ্র অঞ্চল প্রাচীন আগ্নেয়শিলার দ্বারা ( গ্রানাইট – নিস ) গঠিত বলিয়া এখানকার অবশিষ্ট মৃত্তিকা বিশেষ উর্বর নয় । বালুকাজাতীয় লাল মৃত্তিকা ও ল্যাটারাইট মৃত্তিকা অধিকাংশ অঞ্চলে দেখিতে পাওয়া যায় । এই সকল অনুর্বর মৃত্তিকায় কৃষিকার্য করা কষ্টকর এবং জলসেচের একান্ত প্রয়োজন । তাছাড়া দাক্ষিণাত্যের মালভূমির মধ্যেকার অঞ্চল বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে অবস্থান করায় সেখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কম । এই কারণে মালভূমির মধ্যভাগে প্রধানতঃজোয়ার , বাজরা , রাগী , বাদাম , তুলা ( সামান্য ) প্রভৃতি শুষ্ক অঞ্চলের ফসল উৎপন্ন হয় । কেবল মালভূমির উত্তর – পশ্চিমে লাভাদ্বারা আবৃত অঞ্চলে উর্বর কৃষ্ণ – মৃত্তিকায় প্রচুর তুলা ও ইক্ষুর চাষ হয় । কেরালা , কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুর পার্বত্য অঞ্চলে রবার , কফি ও চা – এর চাষ হয়ে থাকে ।

৩. শিল্পসমৃদ্ধিঃ  খনিজের কিছু কিছু – যেমন , লৌহ – আকরিক , ম্যাঙ্গানীজ , অভ্র প্রভৃতি বিদেশেও রপ্তানি করা হয় । খনিজসম্পদগুলিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু শিল্পও এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে । যেমন – কার্পাস – বয়ন শিল্প , বিভিন্ন ধাতব শিল্প প্রভৃতি । 

৪. জলবিদ্যুৎ উৎপাদনঃ মালভূমির বন্ধুর ভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলি খরস্রোতা হওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযােগী । পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিমটালের খরস্রোতা নদীগুলির সাহায্যে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়িয়া উঠেছে । এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি পশ্চিমাঞ্চলে ( বিশেষতঃ বােম্বাই শিল্পাঞ্চল ) কয়লার ভাব কিছুটা দূর করেছে ।

৫. বনজ সম্পদ আহরণঃ পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাট পর্বতমালা ও তাদের মধ্যবর্তী মালভূমির এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল বনভূমির দ্বারা আবৃত থাকায় বেশ কিছু লােক এই বনজসম্পদ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে । মধ্যপ্রদেশ কাষ্ঠব্যবসায়ের জন্য প্রসিদ্ধ । পশ্চিম ঘাট পর্বতের পশ্চিম ঢালে প্রচুর বৃষ্টিপাতের জন্য বনভূমির প্রাধান্য থাকিলেও বন্ধুর ভূ – প্রকৃতির জন্য যাতায়াত ব্যবস্থার অসুবিধা থাকায় বনজসম্পদ আহরণে বিঘ্ন ঘটে । 

৬. পর্যটন শিল্পঃ উটি এই অঞ্চলের বিখ্যাত শৈল পর্যটন কেন্দ্র । তাছাড়াও, নেতারহাট, পাঁচমারি প্রভৃতিও এই অঞ্চলের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র ।

৭. পরিবহণের প্রসারঃ মালভূমি অঞ্চলের ভূ – প্রকৃতি উত্তরের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের ন্যায় তত বন্ধুর না হওয়ায় খনিজসম্পদ আহরণের জন্য সুন্দর যােগাযােগ ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে ।

৮. জনবসতির প্রসারঃ জনবসতি উত্তর ভারতের সমভূমি অঞ্চলের মত গড়ে না উঠলেও নদী উপত্যকা এবং খনিজ ও বনজসম্পদগুলিকে কেন্দ্র করে বসতি গড়ে উঠেছে ।