ভারতের উপদ্বীপীয় উচ্চভূমি অঞ্চল সম্পর্কে লেখ।

ভারতের বিশাল সমভূমি অঞ্চলের দক্ষিণে উপদ্বীপীয় উচ্চভূমি অঞ্চল অবস্থিত । কচ্ছ থেকে আরাবল্লী পর্বতের পশ্চিম সীমা দিয়ে দিল্লী এবং তার পর যমুনা ও গঙ্গার সমান্তরালে রাজমহল পাহাড় পর্যন্ত যে রেখা টানা যায় , তার দক্ষিণে ভারতের শেষ সীমা কন্যাকুমারিকা অন্তরীপ পর্যন্ত ত্রিভুজাকার অঞ্চলকে উপদ্বীপীয় উচ্চভূমি অঞ্চল বলে । এই অঞ্চলের উভয়পার্শ্বে উপকূলবর্তী নিম্নভূমি এবং মধ্যভাগে বিভিন্ন উচ্চতার বহু মালভূমি ও উচ্চভূমি দেখতে পাওয়া যায় । ভূ – তাত্ত্বিক গঠন বিচারে ভারতের ভারতের ভূ – প্রকৃতি ও গঠন উত্তর – পূর্বে অবস্থিত মেঘালয় মালভূমিও এই অঞ্চলের মালভূমিগুলির সমপর্যায়ভুক্ত । কিন্তু ভৌগােলিক অবস্থান বিচারে এটি এই অঞ্চলের অন্তভুক্ত নয় ।
এই উপদ্বীপ অঞ্চলের প্রায় মধ্য অংশ দিয়ে বিন্ধ্য ও সাতপুরা পর্বতের মধ্যে অবস্থিত নর্মদা – উপত্যকা এবং আরও উত্তর – পূর্বে শােন নদী – উপত্যকা বরাবর যে রেখা টানা যায় , তা এই উপদ্বীপ অঞ্চলকে দুইটি অংশে বিভক্ত করছে । যথা – ( ক ) মধ্য ভারতের উচ্চভূমি ও ( খ ) উপদ্বীপীয় মালভূমি । নিচে এদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল –

( ক ) মধ্য ভারতের উচ্চভূমি ( Central Highlands ): এই অঞ্চল পশ্চিমে আরাবল্লী পৰ্বত থেকে পূর্বে শােন নদী উপত্যকার উত্তর – পশ্চিমে অবস্থিত রেওয়ার মালভূমি বা বিন্ধ্যের খাড়া ঢাল এবং দক্ষিণে নর্মদা – উপত্যকা থেকে উত্তরে সিন্ধু – গাঙ্গেয় সমভূমির দক্ষিণ সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত । মধ্যপ্রদেশের প্রায় অর্ধেক , রাজস্থানের ১/৩ অংশ এবং উত্তরপ্রদেশের সামান্য অংশ এই অঞ্চলের অন্তর্গত । সমগ্র ভারতের ১/৬ অংশ এই অঞ্চলকে অধিকার করে আছে । সমগ্র অঞ্চল দক্ষিণ হইতে উত্তর ও উত্তর পূর্বে ঢালু ( ৫০০-১০০ মিটার ) হয়ে গেছে । এই অঞ্চলের উত্তরাংশ বিন্ধ্যযুগের বেলেপাথর , কাদাপাথর এবং গ্রানাইট ও নিস্ ( বুন্দেলখণ্ড নিস্ ) শিলার দ্বারা গঠিত । কিন্তু দক্ষিণাংশে মালব মালভূমি ও বিন্ধ্য পর্বতের পশ্চিমাংশ লাভা দ্বারা ( ক্রিটেসিয়াস যুগের ) আবৃত । সমগ্র অঞ্চলকে আবার নিম্নলিখিত কয়েকটি ক্ষুদ্র অঞ্চলে বিভক্ত করা যায় । যথা— ( i ) আরাবল্লী পাহাড় , ( ii ) পূর্ব – রাজস্থান উচ্চভূমি , ( iii ) মধ্য ভারত পাথর , ( iv ) বুন্দেলখণ্ড উচ্চভূমি , ( v ) মালব মালভূমি , ( vi ) রেওয়া মালভূমি বা বিন্ধ্যের খাড়া ঢাল , ( vii ) বিন্ধ্যপর্বত ও ( vii ) নর্মদা উপত্যকা । নিচে এগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল –

( i ) আরাবল্লী পাহাড়ঃ পৃথিবীর একটি অতি সুপ্রাচীন ( প্যালিওজোয়িক যুগের ) ভঙ্গিল পর্বত । বহুযুগ ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েও এটি আজও দণ্ডায়মান আছে । আমেদাবাদের কিছু উত্তর থেকে দিল্লীর দক্ষিণ পর্যন্ত প্রায় ৮০০ কিঃ মিঃ ব্যাপী এটি বিস্তৃত । এই বিস্তৃতি সাধারণভাবে দক্ষিণ – পশ্চিম থেকে উত্তর – পূর্বে । আরাবল্পী সর্বত্র সমান উঁচু নয় । মধ্য অংশে রেওয়ারের দক্ষিণে উচ্চতা সর্বাধিক । এখানে গড় উচ্চতা ৬০০-৯০০ মিটারের মধ্যে । আরাবল্লীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট আবু ( ১,১৫৮ মিঃ ) এই অংশেই অবস্থিত । উত্তর – পূর্বে দিল্লীর নিকট আরাবল্পীর উচ্চতা কমে গিয়ে প্রায় সমভূমির সাথে মিশে গেছে । এই অংশটি দিল্লী শৈলশিরা নামে খ্যাত । বানস ও লুনি নদীদ্বয় আরাবল্লাকে ব্যবচ্ছিন্ন করেছে । 

( ii ) পূর্ব – রাজস্থান উচ্চভূমি( ii ) মধ্য ভারতের পাথুরে মালভূমিঃ এই দুইটি মালভূমি আরাবল্লীর পূর্বে অবস্থিত । এই দুই মালভূমি বিন্ধ্যযুগের বেলেপাথর , কাদাপাথর ( শেল ) প্রভৃতি শিলার দ্বারা গঠিত । এই অঞ্চল দক্ষিণ – পশ্চিম হইতে উত্তর – পূর্বে ক্রমশঃ ঢালু হয়ে গেছে । এই অংশের উচ্চতা ২৫০-৫০০ মিটার । চম্বল ও তার উপনদী বানস এই অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত । চম্বল নদীর উভয় তীরে ভূমিক্ষয় লক্ষ্য করবার মত । চম্বল নদীর পূর্বদিকে মধ্য – ভারত পাখর অঞ্চল প্রস্তরখণ্ডে পূর্ণ ও ঘন বনভূমির দ্বারা আবৃত ।

( iv ) বুন্দেলখণ্ড মালভূমিঃ এই উচ্চভূমি গ্রানাইট ও নিস শিলার দ্বারা গঠিত বলে সর্বত্রই একপ্রকার গােলাকৃতি ভূমিরূপ এখানে দেখতে পাওয়া যায় । এই মালভূমিও দক্ষিণ থেকে উত্তরে ক্রমশঃ ঢালু ( ৩০০-১০০ মিটার ) হয়ে গেছে । বেতােয়া ও কেন নদী এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত । 

( v ) মালব মালভূমিঃ বিন্ধ্য পর্বতের ঠিক উত্তরে এটি অবস্থিত এবং লাভা ( ব্যাসল্ট ) দ্বারা আবৃত । এই কারণে এই অঞ্চলের পর্বত শিখরগুলি চ্যাপ্টা । সমগ্র অঞ্চল দক্ষিণ – পশ্চিম থেকে উত্তর – পূর্বে ঢালু এবং এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বেতােয়া , পার্বতী , সিন্দ , চম্বল , মাহি নদী প্রবাহিত । মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভূপাল এই অংশে বেতােয়া ও পার্বতী নদীর মধ্যে অবস্থিত ।

( vi ) রেওয়ার মালভূমিঃ এই উচ্চভূমিটি বুন্দেলখণ্ড মালভূমি ও শােন নদীর মধ্যে অবস্থিত । এটি বিন্ধ্যযুগের কাইমুর , রেওয়া ও ভাণ্ডার উপযুগের বেলেপাথরে গঠিত তিনটি খাড়া ঢালে পশ্চিম থেকে পূর্বে সিড়ির ন্যায় ক্রমশঃ নেমে গেছে । এই তিনটি মালভূমি দক্ষিণে একটি বৃহৎ খাড়া ঢালে মিলিত হয়েছে । এই খাড়া ঢাল কাইমুর পাহাড় নামে পরিচিত । 

( vii ) বিন্ধ্যপর্বতঃ এটি পশ্চিম উপকূলের নিকট থেকে পূর্বে প্রায় ১,০৫০ কিলােমিটার দীর্ঘ । সাধারণভাবে এই পর্বতের গড় উচ্চতা ৩০০ মিটারের মধ্যে । দক্ষিণে বিন্ধ্য পর্বত নর্মদা – উপত্যকায় খাড়াভাবে নেমে গেছে , কিন্তু উত্তরে এটি ধীরে ধীরে ঢালু হয়েছে । বিন্ধ্য ও তার দক্ষিণে সাতপুরা পর্বতশ্রেণীকে উত্তর – ভারত ও দাক্ষিণাত্যের সীমারেখা ধরা হয় । মধ্যপ্রদেশের ‘ ধর ’ জেলার গােমানপুর চূড়া ( ৫৫৪ মিঃ ) বিন্ধ্যের পশ্চিম সীমা । এখান থেকে পূর্বে প্রায় ৩০০ কিঃ মিঃ পর্যন্ত অঞ্চল লাভা ( ব্যাসল্ট ) দ্বারা আবৃত । হােসাঙ্গাবাদের পর থেকে ব্যাসল্টের পরিবর্তে বেলে পাথর ও কাদাপাথর ( শেল ) দেখতে পাওয়া যায় । বিন্ধ্যের পূর্বাংশ কাইমুর পাহাড় নামে পরিচিত এবং এটি কোয়ার্টজাইট ও মার্বেল পাথরে গঠিত ।

( viii ) নর্মদা উপত্যকাঃ এটি দুইটি সমান্তরাল চ্যুতির ফলে সৃষ্ট হইয়াছে । উত্তরে বিন্ধ্য ও দক্ষিণে সাতপুরা পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান চ্যুতির ফলে অবনমিত হয়ে এটি সৃষ্টি করেছে ।

( খ ) উপদ্বীপীয় মালভূমি ( Peninsular Plateaus ): ত্রিভুজাকার উপদ্বীপীয় মালভূমি অঞ্চল উত্তরে সাতপুরা – মহাদেব – মহাকাল , পশ্চিমে পশ্চিমঘাট পর্বত এবং পূর্বে পূর্বঘাট দ্বারা বেষ্টিত । ত্রিভুজাকৃতি এই মালভূমি অঞ্চলটির তিনদিক সমুদ্র – বেষ্টিত । পূর্বে আছে বঙ্গোপসাগর , পশ্চিমে আরব সাগর এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগর । উত্তর থেকে দক্ষিণে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১,৭০০ কিঃ মিঃ এবং পশ্চিমে পশ্চিমঘাট পর্বত থেকে পূর্বে রাজমহল পর্যন্ত প্রস্থে প্রায় ১,৪০০ কিঃ মিঃ । এর আয়তন প্রায় ১৩.৫ লক্ষ বর্গকিলােমিটার ।
এই মালভূমি অঞ্চলকে নিম্নলিখিত চারটি প্রধান ভূ – প্রাকৃতিক অঞ্চলে বিভক্ত করা যায় । যথা – ( i ) পশ্চিমঘাট বা সহাদ্রি পর্বত , ( ii ) পূর্বঘাট পাহাড় বা মহেন্দ্রগিরি , ( ii ) দাক্ষিণাত্যের মালভূমি ( উত্তর ও দক্ষিণ ) এবং ( iv ) পূর্বের মালভূমি । নিচে এগুলি বিস্তারিত আলোচনা করা হল –

( i ) পশ্চিমঘাট বা সহ্যাদ্রি পর্বতঃ পশ্চিম – উপকূল হইতে এই পূর্বতকে দেখলে একটি খাড়া প্রাচীরের ন্যায় ( প্রায় ১,০০০ মিটার উচ্চ ) দেখায় । এই পর্বত পশ্চিমে আরব সাগর উপকূল থেকে খাড়াভাবে উঠে প্রায় একটানা ভারতের পশ্চিম উপকূলবরাবর ১,৬০০ কিঃ মিঃ ব্যাপিয়া উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত । কিন্তু পূর্বদিকে এটি ক্রমশঃ ধীরে ধীরে নেমে তরঙ্গায়িত মালভূমিতে মিশেছে । পশ্চিমঘাট পর্বতের উত্তরাংশের প্রথম ৬৪০ কিঃ মিঃ ( গােয়ার উত্তরাংশ পর্যন্ত ) সমান্তরাল লাভাস্তর দ্বারা আবৃত । ব্যাসন্ট লাভাদ্বারা আবৃত এই অংশে পর্বতের চূড়াগুলি চ্যাপ্টা এবং পূর্বদিক থেকে দেখলে মনে হয় এটি সিড়ির ন্যায় ধাপে ধাপে পূর্বদিকে ক্রমশঃ নেমে গেছে । পশ্চিমঘাট পর্বতের এই অংশে উচ্চতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৯০০-১,২০০ মিটারের মধ্যে । তবে বহু ক্ষেত্রে পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা ১,৩০০-১,৬০০ মিটার । এখানকার উচ্চতম শৃঙ্গগুলির মধ্যে হরিশ্চন্দ্রগড় : ( ১,৪২৪ মিঃ ) , মহাবালেশ্বর ( ১,৪৩৮ মিঃ ) , কালসুবাই ( ১,৬৪৬ মিঃ ) সালহের ( ১,৫৬৭ মিঃ ) বিশেষ উল্লেখযােগ্য । থলঘাট ও ভােরঘাট এই অংশের দুইটি উল্লেখযােগ্য গিরিপথ । এদের মধ্য দিয়া রেলপথ ও সড়কপথ দাক্ষিণাত্যের মালভূমির সাথে পশ্চিম উপকূলের কঙ্কণ সমভূমির যােগাযােগ রক্ষা করছে ।
গোয়ার উত্তরাংশের পর থেকে দক্ষিণে পশ্চিমঘাট পর্বতের বাকী ৬৪০ কিঃ মিঃ পর্যন্ত অংশ ব্যাসল্টের পরিবর্তে গ্রানাইট – নিস্ শিলার দ্বারা গঠিত বলে এই অংশে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ভূমিরূপ দেখতে পাওয়া যায় । এই অংশে পর্বত – শিখরগুলি চ্যাপ্টার পরিবর্তে গােলাকার । অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই উচ্চতা ৯০০ মিটারের কম । তবে নীলগিরি পর্বতের নিকট এর উচ্চতা অধিক । বাবুমালা ( ২,৩৩৯ মিঃ ) এই অংশে সর্বোচ্চ শৃঙ্গ । পশ্চিমঘাট পর্বত এই অংশে সমুদ্রোপকূলের খুবই নিকট দিয়ে গেছে এবং অবশেষে দক্ষিণে গুডালুরের নিকট নীলগিরি পর্বতে মিলিত হয়েছে ।
নীলগিরি পর্বতের প্রাকৃতিক শোভা অতুলনীয় । এটি দক্ষিণ ভারতের একটি উল্লেখযােগ্য পর্বতগ্রন্থি । এখানেই পশ্চিমঘাট , পূর্বঘাট ও দক্ষিণঘাট পর্বতগুলি মিলিত হয়েছে । নীলগিরি চার্ণকাইট নামক কঠিন শিলায় গঠিত হওয়ায় পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বেশ কিছুটা উঁচু । দোদাবেতা ( ২,৬৩৭ মিঃ ) ও মাকুতি ( ২,৫৫৪ মিঃ ) এর দুইটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ । দোদাবেতার পাদদেশে দক্ষিণ – ভারতের বিখ্যাত শৈলশহর উটি অবস্থিত । নীলগিরির দক্ষিণে করিমালাই ( ১,৯৯৬ মিঃ ) ও আন্নামালাই সংলগ্ন পাদগিরিমালাই ( ১,৫২৭ মিঃ ) পাহাড় দুইটির মধ্যবর্তী অঞ্চল বসে গিয়ে পালঘাট ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে । এটি মাত্র ১৪৪ মিঃ উঁচু এবং এর মধ্য দিয়ে রেল ও সড়কপথে পশ্চিম উপকূলের সাথে দাক্ষিণাত্য মালভূমির যােগাযােগ রক্ষা করা হয় ।
পালঘাটের দক্ষিণে সহাদ্রি বা পশ্চিমঘাট পর্বতমালা দক্ষিণঘাট পর্বত নামে আরও দক্ষিণে কন্যাকুমারিকা অন্তরীপ পর্যন্ত প্রসারিত । দাক্ষিণাত্যের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আনাইমুদি ( ২,৬৯৫ মিঃ ) এখানে অবস্থিত । আনাইমুদি থেকে পর্বতশ্রেণী বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেছে । এরা হল উত্তরে আনাইমালাই , উত্তর – পূর্বে পালনি এবং দক্ষিণে কার্ডামাম বা এলামালাই । কোদাইকানাল ( ২,১৯৫ মিঃ ) দক্ষিণের অপর একটি শৈলশহর পালনি পর্বতে অবস্থিত । কার্ডামাম পাহাড়ের দক্ষিণে শেঙ্কোটা নামক সর্ব দক্ষিণের গিরিপথটি অবস্থিত । কুইলন ( কেরালায় ) হইতে এই গিরিপথের মধ্য দিয়া তামিলনাড়ুর তিরুনেল উপত্যকায় রেলপথে যােগাযােগ রক্ষা করা হয় । কার্ডামাম বা এলামালাই আরও দক্ষিণে অগস্ত্যমালাই রূপে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত প্রসারিত । 

( ii ) পূর্বঘাট পাহাড় বা মহেন্দ্রগিরিঃ পূর্বঘাট পর্বতমালা সহ্যাদ্রির ন্যায় একটানা নয় । এটি উপকূল থেকে কিছু অভ্যন্তরে উত্তর – পূর্ব থেকে দক্ষিণ – পশ্চিমে বিস্তৃত । এই পর্বত উত্তর – পূর্বে দণ্ডকারণ্যের পূর্বদিক থেকে ( ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশ ) শুরু করে তামিলনাড়ুর দক্ষিণ – পশ্চিমে মধ্য দিয়া নীলগিরির নিকট পশ্চিমঘাট পর্বতে মিলিত হয়েছে । পূর্বঘাট পাহাড়ের উচ্চতাও পশ্চিমঘাট অপেক্ষা কম ( ৪৫০-৬০০ মিঃ ) । এই কারণে একে পূর্বঘাট পর্বত না বলিয়া পূর্বের পাহাড় ( Eastern Hills ) বলা হয় । পূর্বঘাট পাহাড়ের উত্তরাংশ , বিশেষতঃ গােদাবরী ও মহানদীর মধ্যবর্তী অংশ কিছুটা একটানা চলে গেছে এবং এটি বন্ধুর ও পর্বতময় । এই অংশেই ওড়িশার গঞ্জাম জেলা থেকে ৮০ কিঃ মিঃ দক্ষিণ – পশ্চিম উপকূলবর্তী নিম্নভূমির ঠিক উপরেই মহেন্দ্র গিরি ( ১,৫০১ মিঃ ) নামক একটি পর্বতশিখর অবস্থিত । এই পর্বতশিখরের নাম থেকেই পূর্বঘাটের অপর নাম মহেন্দ্রগিরি হয়েছে ।
পূর্বঘাটের দক্ষিণের অংশ কিন্তু একটানা নয় । প্রকৃতপক্ষে এই অংশে পূর্বঘাট পাহাড় কতকগুলি বিচ্ছিন্ন মালভূমির অবশিষ্টাংশের সমষ্টি এবং এদের মধ্যে মধ্যে প্রশস্ত নদী – উপত্যকার দ্বারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন । উত্তরে কৃষ্ণা ও দক্ষিণে পেন্নার নদীর মধ্যে করমণ্ডল উপকূলের সমান্তরালে নাল্লামালাই পাহাড় উত্তর – দক্ষিণে বিস্তৃত । এর দক্ষিণের অংশ অপেক্ষাকৃত উচু ( ৯০০-১,১০০ মিঃ ) এবং পালকোণ্ডা নামে পরিচিত । নাল্লামালাই – এর পূর্বে আছে ভেলিকোণ্ডা পাহাড় ।। আরও দক্ষিণে তামিলনাড়ুর আর্কট জেলায় যে সকল অবশিষ্ট পাহাড় দেখা যায় , তাহাদের মধ্যে জভদি , শেভারয় , পচামালাই প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযােগ্য । এই সকল পাহাড় নিস্ শিলায় গঠিত ।
তামিলনাদ উচ্চভূমিঃ তামিলনাড়ু রাজ্যে পূর্বঘাট পাহাড়ের পাদদেশে যে পাহাড়ী অঞ্চল দেখতে পাওয়া যায় , তাকে তামিলনাদ উচ্চভূমি বলা হয় । একে অনেকে ভারতের একটি বিশিষ্ট ‘ পেডিপ্লেন ’ অঞ্চল বলে অভিহিত করেন । দক্ষিণে ভাইগই হইতে উত্তরে পালার পর্যন্ত পূর্ববাহিনী নদীসমূহকে পূর্ব – উপকূলে প্রবেশ করতে এই উচ্চভূমি অতিক্রম করতে হয় ।

( iii ) দাক্ষিণাত্যের মালভূমিঃ এই বিস্তীর্ণ মালভূমিকে ভূমিরূপের তারতম্যে প্রধান দুইটি অংশে বিভক্ত করা যায় । যথা – A. দাক্ষিণাত্যের মালভূমির উত্তর অংশ এবং B. দাক্ষিণাত্যের মালভূমির দক্ষিণ অংশ । নিচে এগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল –

A. দাক্ষিণাত্যের মালভূমির উত্তর অংশঃ এই অঞ্চলটি উত্তরে ( i ) সাতপুরা এবং তার ঠিক দক্ষিণে ( ii ) মহারাষ্ট্রের মালভূমি নিয়ে গঠিত ।
( a ) সাতপুরা পর্বতঃ বিন্ধ্যের দক্ষিণে নর্মদা – উপত্যকার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত । এটি পশ্চিমে রতনপুর থেকে পূর্বে অমরকন্টক পর্যন্ত প্রায় ৯০০ কিলােমিটার দীর্ঘ । এই পর্বতের অধিকাংশই ৫০০ মিটারের অধিক উঁচু এবং কতকগুলি পর্বতশিখরের উচ্চতা ১,০০০ মিটারেরও বেশী । দক্ষিণঢালে আরও একটি গ্রস্ত উপত্যকার সৃষ্টি হয়েছে । এর মধ্য দিয়ে তাপ্তী ( তাপী ) নদী প্রবাহিত । সুতরাং নর্মদা ও তাপ্তী এই দুইটি গ্রস্ত – উপত্যকার মধ্যে অবস্থিত সাতপুরা একটি স্তুপপর্বত । পশ্চিম থেকে পূর্বে এর তিনটি অংশ বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায় । পশ্চিমের অংশ ব্যাসল্ট দ্বারা আবৃত এবং খুবই বন্ধুর । এই অংশ সাতপুরা নামেই পরিচিত । তবে স্থানীয় অধিবাসীদের নিকট ইহা রাজপিপলা পাহাড় নামেই পরিচিত । সাতপুরার মধ্যভাগ বেশ প্রশস্ত এবং এটি উত্তরে মহাদেব এবং দক্ষিণে গাউইলগড় পাহাড় দুটি দ্বারা বেষ্টিত । সাতপুরার সর্বোচ্চ শিখর ধূপগড় ( ১,৩৫০ মিঃ ) । সাতপুরার পূর্বাংশ মহাকাল নামে পরিচিত ।
( b ) মহারাষ্ট্র মালভূমিঃ এটি সাতপুরার দক্ষিণে অবস্থিত । এর অধিকাংশই ব্যাসল্ট লাভাদ্বারা আবৃত । এই কারণে এই অঞ্চলে পাহাড়ের চূড়াগুলি চ্যাপ্টা ( টেবিলের মত ) এবং দুই পাশ খাড়াভাবে ক্রমশঃ নেমে গেছে । সমগ্র মালভূমি অঞ্চল এইরূপ চ্যাপ্টা চূড়াবিশিষ্ট হয়ে ধাপে ধাপে পশ্চিম থেকে পূর্বে ক্রমশঃ নেমে গেছে ।

B. দাক্ষিণাত্যের মালভূমির দক্ষিণ অংশঃ এই অঞ্চল প্রধানতঃ কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানা মালভূমির অন্তর্গত । এই অঞ্চল গ্রানাইট – নিস্ শিলার দ্বারা গঠিত বলে উত্তরে মহারাষ্ট্র মালভূমির চ্যাপ্টা পাহাড়ের চূড়ার পরিবর্তে গােলাকার পাহাড়ের চূড়া দেখতে পাওয়া যায় । এই মালভূমি – পৃষ্ঠ অনেকটা সমতল । কর্ণাটক মালভূমির পশ্চিমঘাট পর্বতের পাদদেশ অঞ্চলে উত্তর – দক্ষিণে বিস্তৃত কিছুটা অঞ্চল বন্ধুর ও পর্বতময় । এই পর্বতময় অঞ্চল মালনাদ ( পাহাড়ী অঞ্চল ) নামে পরিচিত । পূর্বদিকের বাকী অংশ কিন্তু তরঙ্গায়িত উচ্চভূমির ন্যায় এবং এর মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে আছে কঠিন শিলায় গঠিত অবশিষ্ট পাহাড় । পূর্বের এই তরঙ্গায়িত উচ্চভূমি অঞ্চল ময়দান নামে পরিচিত । তেলেঙ্গানা মালভূমিও কর্ণাটক মালভূমির ন্যায় আর্কিয়ান যুগের গ্রানাইট – নিস শিলায় গঠিত বলে সর্বত্র একটি তরঙ্গায়িত ও গােলাকৃতি ভূমিরূপ দেখতে পাওয়া যায় ।

( iv ) পূর্বের মালভূমিঃ শােন নদী অববাহিকার দক্ষিণ – পূর্বে এবং মহাকাল পর্বতের পূর্বে যে মালভূমি অবস্থিত , তাদের একত্রে পূর্বের মালভূমি বলা হয় । এই মালভূমি অঞ্চলে আছে বাঘেলখণ্ড মালভূমি , ছোটনাগপুর মালভূমি , মহানদী অববাহিকা ও দণ্ডকারণ্য ।
a) বাঘেলখণ্ড মালভূমি মহাকাল পর্বতের পূর্বে এবং মহানদী – অববাহিকার উত্তরে অবস্থিত । এটি গ্রানাইট শিলা এবং বিন্ধ্যযুগের পাললিক শিলার দ্বারা গঠিত ।
b) ছােটনাগপুর মালভূমি বাঘেলখণ্ড মালভূমির পূর্বে অবস্থিত । ইহা প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন উচ্চতায় অবস্থিত কতকগুলি মালভূমির সমষ্টি । পশ্চিমদিকের পাট অঞ্চলটি সর্বাপেক্ষা উচ্চ ( ১,১০০ মিঃ ) এবং ইহা পূর্বদিকে ধাপে ধাপে নেমে অবশেষে গঙ্গা সমভূমিতে মিশেছে । এই মালভূমির প্রাকৃতিক বিভাগ চারটি — রাচী মালভূমি , হাজারীবাগ মালভূমি ( ৭০০ মিঃ ) , কোডার্মা মালভূমি এবং দামােদর – উপত্যকা ।ছােটনাগপুর মালভূমি উত্তর – পূর্ব কোণে রাজমহলের উচ্চভূমিতে গিয়ে মিশেছে । আগ্নেয়গিরির লাভাদ্বারা গঠিত রাজমহল পাহাড় উত্তর – দক্ষিণে বিস্তৃত এবং ৩০০-৪৫০ মিটার উঁচু ।
c) মহানদী – অববাহিকা বাঘেলখণ্ড মালভূমির দক্ষিণে অবস্থিত । এই অববাহিকা ২০০ মিটার উঁচু এবং এর চারধারে আছে ৬০০-১,০০০ মিটার উঁচু পাহাড় । মহানদী অববাহিকার মধ্যভাগ ছত্তিসগড় সমতলক্ষেত্র নামে পরিচিত । এটি চুনাপাথর ও শেলদ্বারা গঠিত ।
d) দণ্ডকারণ্য অঞ্চল ছত্তিসগড় সমভূমির দক্ষিণে বাস্তার , কোরাপুট ও কালাহাণ্ডি জেলাগুলি নিয়ে গঠিত । কোরাপুট অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা উচ্চতা ১,২০০ মিঃ  । মালভূমির উত্তরাংশ নীচু এবং পশ্চিমাংশ গভীর নদী – উপত্যকা দ্বারা ব্যবচ্ছিন্ন । রাঁচী মালভূমির দক্ষিণে ওড়িশায় ধারওয়ার যুগের কতকগুলি অবশিষ্ট পাহাড় আছে । পাহাড়গুলির উচ্চতা ৪০০-১,০০০ মিটার । বােনাই , কেওনঝাড় ও সিমলিপাল পাহাড়গুলি এর অন্তর্গত । এই অঞ্চলকে গড়জাট বলা হয় ।
ভারতের উত্তর – পূর্বে অবস্থিত মেঘালয় মালভূমিও দাক্ষিণাত্যের মালভূমির একটি অংশ । এটি গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পলি সঞ্চয়ের ফলে দাক্ষিণাত্যের মালভূমি হইতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে ।