উত্তর ভারতের বিশাল সমভূমি সম্পর্কে লেখ।

অবস্থান ও আয়তনঃ ভারতের উত্তরে হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল এবং দক্ষিণে দক্ষিণপথ মালভূমির অন্তর্গত মধ্য – ভারতের উচ্চভূমির মধ্যবর্তী অঞ্চল ‘ উত্তর – ভারতের বিশাল সমভূমি ’ নামে পরিচিত । এই সমভূমি পূর্ব – পশ্চিমে প্রায় ২,৫০০ কিলােমিটার দীর্ঘ এবং উত্তর – দক্ষিণে প্রায় ২৪ ০-৩২০ কিলােমিটার প্রশস্ত । সমগ্র সমভূমির আয়তন প্রায় ৬,৫২,০০০ বর্গ কিলােমিটার । এই সমভূমির পশ্চিম ও দক্ষিণ – পশ্চিমের অংশ যথাক্রমে পাঞ্জাব সমভূমি ও শুষ্ক রাজস্থানের সমভূমির অন্তর্গত এবং ইহার অধিকাংশ দক্ষিণ – পশ্চিমে ঢালু । পাঞ্জাব সমভূমি সিন্ধুর বিভিন্ন উপনদীর ( শতদ্রু , বিপাশা প্রভৃতি ) পলিদ্বারা গঠিত । এটি দক্ষিণ – পশ্চিমে রাজস্থানের শুষ্ক সমভূমিতে মিশেছে । রাজস্থান সমভূমির পশ্চিম অংশ সিন্ধু – উপত্যকায় ( পাকিস্তান ) এবং দক্ষিণ অংশ কচ্ছের রণে মিলিত হয়েছে । দিল্লী থেকে আরাবল্লী পাহাড় পর্যন্ত একটি শৈলশিরা পাঞ্জাব সমভূমি ও গাঙ্গেয় সমভূমির মধ্যে একটি গৌণ জলবিভাজিকারূপে অবস্থান করছে । পাঞ্জাব সমভূমির পূর্ব সীমানায় যমুনা নদী থেকে দক্ষিণ – পূর্বদিকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিশাল অঞ্চল গঙ্গা ও তাহার বিভিন্ন উপনদী ও শাখা – নদীর পলিদ্বারা গঠিত । এটিই বিখ্যাত গাঙ্গেয় সমভূমি । গাঙ্গেয় সমভূমি উত্তরপ্রদেশ , বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে অবস্থিত এবং এর মােট আয়তন ৩,৫৭,০০০ বর্গ কিলােমিটার । জনসংখ্যা ও কৃষিজ – সম্পদে এই সমভূমি পৃথিবীর মধ্যে অদ্বিতীয় । গাঙ্গেয় সমভূমির উত্তর – পূর্বে অসমে ব্ৰহ্মপুত্র নদ ও তাহার বিভিন্ন উপনদী ও শাখা – নদীবাহিত পলিদ্বারা গঠিত সমভূমি ব্ৰহ্মপুত্ৰ – উপত্যকা নামে পরিচিত । এই উপত্যকাও ‘ উত্তর – ভারতের বিশাল সমভূমির অন্তভুক্ত । এই সমতলক্ষেত্র প্রায় ৭০০ কিঃ মিঃ দীর্ঘ এবং ৮০ কিঃ মিঃ প্রশস্ত । এর আয়তন প্রায় ৫৬,০০০ বর্গ কিলােমিটার ।

আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যঃ ভারতের বিশাল সমভূমির ভূ – প্রকৃতিগত বৈচিত্র্য বিশেষ না থাকায় একে ক্ষুদ্রতর অঞ্চলে বিভক্ত করা খুবই কঠিন ব্যাপার । তবে বৃষ্টিপাত , কৃষিজ পণ্যের তারতম্য ও কিছুটা ভূ – প্রকৃতির বৈচিত্র্য অনুসারে এই সমভূমিকে নিম্নলিখিত অঞ্চলে বিভক্ত করা যায় । যথা – ক) রাজস্থানের শুষ্ক সমভূমি , খ) পাঞ্জাব হরিয়ানা সমভূমি , গ) গঙ্গা সমভূমি ( উচ্চ , মধ্য ও নিম্ন – গাঙ্গেয় সমভূমি ) ও ঘ) ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা । নিচে এগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল –

ক) পশ্চিমের সমভূমি বা রাজস্থানের শুষ্ক সমভূমিঃ পাঞ্জাব ও হরিয়ানার শুষ্ক সমভূমি দক্ষিণে ক্রমশঃ রাজস্থানের শুষ্ক সমভূমিতে গিয়া মিশেছে । এটাই পশ্চিমের সমভূমি বা রাজস্থানের শুদ্ধ সমভূমি । এই অঞ্চল দৈর্ঘ্যে উত্তর পূর্ব হইতে দক্ষিণ – পশ্চিমে প্রায় ৬,৪০০ কিঃ মিঃ এবং ইহার গড় – বিস্তার প্রায় ৩০০ কিঃ মিঃ । সমগ্র অঞ্চল প্রায় ১,৭৫,০০০ বর্গ কিলােমিটার স্থান অধিকার করে আছে । এই অঞ্চল সিন্ধু – গঙ্গা সমভূমিরই একটি অংশ , তবে পার্থক্য হল এই যে , এই অঞ্চলে ভূ – পৃষ্ঠের জলপ্রবাহের কার্য অপেক্ষা বায়ুপ্রবাহের ক্রিয়াকলাপের প্রাধান্যই অধিক । এই শুষ্ক সমভূমির অধিকাংশই পার্মো – কার্বনিফেরাস যুগ  থেকে প্লিসটোসেন যুগ পর্যন্ত সমুদ্রের তলদেশে অবস্থান করেছিল । তার পরে প্লিসটোসেন যুগে ভূমিভাগ সমুদ্রের তলদেশ থেকে উপরে উখিত হওয়ার পর এই অঞ্চলের উপর একটি স্বাভাবিক ক্ষয়চক্র ( Normal Cycle of Erosion ) ক্রিয়া করে থাকে । সরস্বতী এবং দ্রীশদবতী প্রভৃতি নদীসমূহের শুষ্ক উপত্যকার অবস্থান পূর্বেকার আর্দ্র জলবায়ুর অস্তিত্বের কথা এবং অঞ্চলটির উর্বরতার কথা প্রমাণ করে থাকে । একমাত্র উল্লেখযােগ্য নদী লুনির ঊর্দ্ধ প্রবাহের জল মিষ্ট , কিন্তু নিম্নপ্রবাহে , বিশেষত বালতােরার পর হঠাৎ দক্ষিণে বাঁক নিয়ে কচ্ছের রণে যেখানে পতিত হয়েছে সেই অংশের জল লবণাক্ত । এই কারণে নদীটির নাম লুনি হয়েছে । লুনির মােহনায় একটি ছােট্ট ব – দ্বীপের অবস্থান প্রমাণ করে যে , এক সময় নদীটি প্রচুর জল বহন করত ।
এই অঞ্চলের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল কেন্দ্রমুখী জলনির্গম প্রণালী । বৃষ্টির সামান্য জল নদী দ্বারা বাহিত হয়ে সমুদ্রে পৌছাতে না পেরে দেশের অভ্যন্তরে নিম্নভূমিতে এসে জমা হয় এবং হ্রদের সৃষ্টি করে । এইভাবে সৃষ্ট বহু লবণ হ্রদ বা ধান্দ , এই অঞ্চলে দেখা যায় । দিদওয়ানা , পাচপদ্র , লুঙ্কাবংশতাল হল উল্লেখযােগ্য লবণ হ্রদ । এই সকল হ্রদের জল থেকে লবণ প্রস্তুত করা হয় ।
এই অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানে চলমান বালির পাহাড় দেখিতে পাওয়া যায় । এদের ধ্রিয়ান ( Dhrian ) বলে । চলমান বালির পাহাড়গুলি ( Shifting Dunes ) দক্ষিণ – পশ্চিম থেকে উত্তর – পূর্বে বায়ুপ্রবাহের সমান্তরালে অনুদৈর্ঘ্য বালিয়াড়িরূপে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করছে । অনেক সময়ে বায়ুপ্রবাহের আড়াআড়িভাবে অবস্থিত তির্যক বালিয়াড়ি বা বার্খান অবস্থান করতেও দেখা যায় । বার্খান অঞ্চলে বালিয়াড়িগুলি ৫০ মিটার থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে । এই অঞ্চলে বহু প্লায়া হ্রদ ( রণ ) দেখতে পাওয়া যায় ।

খ) পাঞ্জাব – হরিয়ানা সমভূমিঃ পাঞ্জাব – হরিয়ানা সমভূমি শতদ্রু , বিপাশা এবং ইরাবতী নদীর দ্বারা বাহিত দ্রব্যাদি সঞ্চিত হয়ে গঠিত হয়েছে । এই সমভূমি অত্যন্ত সমতল এবং গড় উচ্চতা ২০০ হইতে ২৪০ মিটারের মধ্যে । এই সমভূমি অঞ্চলের মাঝে মাঝে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ার ফলে সৃষ্ট সরু ও লম্বা সমতলক্ষেত্র দেখতে পাওয়া যায় । এদের বেট ( Bets ) বলে । এই বেটগুলি ১ কিলোমিটার থেকে ১২ কিলােমিটারের মত চওড়া । এদের দুই পার্শ্বে ৫ মিটার থেকে ১০ মিটার উঁচু ঢিবির অবস্থান দেখা যায় । অঞ্চলের উত্তর – পূর্বে বিভিন্ন দোয়াব সমভূমি দেখতে পাওয়া যায় । ইরাবতী এবং বিপাশা নদীর মধ্যে অমৃতসরকে কেন্দ্র করিয়া বারিদোয়াব , তার পূর্বে বিপাশা ও শতদ্রুর মধ্যে পাঞ্জাবের সর্বাপেক্ষা উন্নত অঞ্চল বিস্ত দোয়াব অবস্থান করছে । বিস্ত দোয়াবের দক্ষিণে অবস্থান করছে মালব বা মালওয়া সমভূমি । এই দোয়াব অঞ্চলগুলিতে বিভিন্ন খালের সাহায্যে জলসেচ করা হয় ।

গ) গঙ্গা সমভূমিঃ গঙ্গা সমভূমি উচ্চ , মধ্য ও নিম্ন — এই তিনটি অংশে বিভক্ত । যথা –
১. উচ্চ – গাঙ্গেয় সমভূমিঃ এই সমভূমির পশ্চিম সীমান্তে যমুনা নদী প্রবাহিত এবং এটি এলাহাবাদের নিকট গঙ্গার সহিত মিলিত হয়েছে । পূর্বদিকে ২০০ মিটার সমােন্নতি রেখা এই অঞ্চলকে মধ্য – গাঙ্গেয় সমভূমি থেকে পৃথক করছে । গঙ্গা ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল গঙ্গা – যমুনা দোয়াব অঞ্চল রূপে পরিচিত । উচ্চ গাঙ্গেয় সমভূমির এটিই সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য অংশ । গঙ্গা – যমুনা দোয়াবের উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশ অঞ্চল থেকে দক্ষিণে গঙ্গা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল আবার দুইটি অংশে বিভক্ত । পশ্চিমের অংশ রােহিখণ্ড সমভূমি এবং পূর্বের অংশ অযােধ্যা সমভূমি নামে পরিচিত । রামগঙ্গা , গােমতী এবং সারদা নদীগুলি এই অঞ্চল দিয়া প্রবাহিত । সমগ্র উচ্চ – গাঙ্গেয় সমভূমি একটি বৈচিত্র্যহীন সমভূমি এবং এটি উত্তর – পশ্চিম হইতে দক্ষিণ – পূর্বে ঢালু । দুই নদীর মধ্যবর্তী ( দোয়াব ) অপেক্ষাকৃত উচ্চ অংশে প্রাচীন পলি ‘ ভাঙ্গর ’ , নদী তীরবর্তী অঞ্চলে নবীন পলি ‘ খাদার ’ এবং তরাই অঞ্চলে ভাবর ’ দ্বারা গঠিত উচ্চভূমি সমভূমির একঘেয়েমির মধ্যে বৈচিত্র্য এনেছে ।
২. মধ্য – গাঙ্গেয় সমভূমিঃ এই সমভূমির পশ্চিমাংশে ( উত্তরপ্রদেশের পূর্বাংশ ) অযােধ্যা সমভূমির পূর্বাংশ অবস্থান করছে । বাকী অংশ বিহার রাজ্যের মধ্যে অবস্থিত । এই সমভূমির পূর্বদিকে রাজমহল পাহাড়ের অবস্থানের ফলে সমভূমি কিছুটা সংকীর্ণ হয়ে গেছে । বিহার অংশে গঙ্গার উত্তর দিকের সমভূমি অঞ্চল উত্তর বিহার সমভূমি এবং গঙ্গার দক্ষিণের সমভূমি অঞ্চল দক্ষিণ বিহার সমভূমি নামে পরিচিত । এই মধ্য – গাঙ্গেয় সমভূমিও উচ্চ – গাঙ্গেয় সমভূমির ন্যায় বৈচিত্র্যহীন । কেবল উত্তরে শিবালিক পর্বতের পাদদেশে এবং দক্ষিণে মালভূমির প্রান্তদেশে কিছু উচ্চভূমির অবস্থান বৈচিত্র্য এনেছে । এই অঞ্চলে খাদার বা নবীন পলল মৃত্তিকা অধিক দেখতে পাওয়া যায় । এই সমভূমি অঞ্চলের মধ্য দিয়া ক্ষুদ্র – বৃহৎ এত অধিক সংখ্যক নদী প্রবাহিত হয়েছে যে , একে অনেক সময় নদ – নদীর দেশরূপে অভিহিত করা হয় । বিভিন্ন নদীর মধ্যে গঙ্গাই প্রধান । এটি সমভূমির দক্ষিণ সীমান্তের নিকট দিয়ে একে বেঁকে প্রায় পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত । গঙ্গার সাথে উত্তর দিক থেকে গােমতী , ঘর্ঘরা বা সরযু , গণ্ডক , কুশী ( কোশী ) এবং উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল থেকে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পার্বত্য নদী এবং দক্ষিণ থেকে শােন নদী এসে মিলিত হয়েছে । এই সকল নদীর মিলিত প্রচেষ্টায় উত্তরে নেপাল হিমালয়ের পাদদেশে প্রায় ২,০০০ মিটার গভীর এক খাদ পলি সঞ্চিত হয়ে ভরাট হয়েছে । এইরূপে উত্তর বিহার সমভূমি গঠিত হয় । এই সমভূমির পশ্চিমাংশের ঢাল দক্ষিণ – পশ্চিমে হলেও পূর্বাংশে এর ঢাল দক্ষিণমুখী । ছাপরার কিছু পূর্ব হইতে খাগরিয়া পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে বেশ কিছু জলাভূমি অবস্থান করতে দেখা যায় । এই জলাভূমিগুলি গঙ্গার সমান্তরালে অবস্থান করছে । এরা স্থানীয় ভাষায় কাউর বা তাল নামে পরিচিত । এদের মধ্যে কতকগুলি এত গভীর হয় যে , সারা বৎসরই এতে জল থাকে ( যেমন , কাবার তাল ) । কাউর অঞ্চলের দক্ষিণে গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলে ভূমিভাগ ক্রমশঃ উঁচু হয়ে স্বাভাবিক বাঁধের ( Levee ) সৃষ্টি করেছে । দক্ষিণ বিহার সমভূমি রাজমহল পাহাড়ের পশ্চিমে ক্রমশঃ বিস্তৃত হয়েছে । এর সর্বাপেক্ষা অধিক বিস্তার হল ১২০ কিঃ মিঃ । এই অঞ্চলের সাধারণ ঢাল হইল উত্তর ও উত্তর – পূর্বে । উত্তর বিহার সমভূমির ন্যায় এই সমভূমি অঞ্চল তত বৈচিত্র্যহীন নহে । তবে এখানেও গঙ্গার স্বাভাবিক বাঁধের দক্ষিণে অবনমিত অংশে জলাভূমি অবস্থান করতে দেখা যায় । পাটনা এবং মােকামার নিকট এইরূপ জলাভূমি বা তাল অঞ্চল দেখতে পাওয়া যায় ।
৩. নিম্ন – গাঙ্গেয় সমভূমিঃ ভূমিরূপের তারতম্য অনুসারে নিম্ন – গাঙ্গেয় সমভূমিকে ( i ) উত্তরবঙ্গ সমভূমি , ( ii ) ব – দ্বীপ অঞ্চল ও ( iii ) রাঢ় সমভূমি — এই তিনটি উপ – অঞ্চলে বিভক্ত করা হয় ।
( i ) উত্তরবঙ্গ সমভূমিঃ উত্তর পূর্ব – হিমালয়ের পাদদেশ অঞ্চল থেকে দক্ষিণে গঙ্গা ব – দ্বীপের উত্তর সীমা পর্যন্ত এই অঞ্চল বিস্তৃত । এর আয়তন হল প্রায় ২৩,০০০ বর্গ কিলােমিটার । এই অঞ্চলের পূর্বদিকে ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন উপনদী এবং পশ্চিমে গঙ্গার বিভিন্ন উপনদী প্রবাহিত । সমগ্র অঞ্চল পূর্ব – হিমালয় থেকে আসা তিস্তা , জলঢাকা , তাের্সা প্রভৃতি বিভিন্ন শক্তিশালী নদীর দ্বারা বাহিত প্রস্তরখণ্ড ও ক্ষয়প্রাপ্ত দ্রব্য সঞ্চিত হয়ে গঠিত হয়েছে । এর উত্তর প্রান্ত পশ্চিম দুয়ার নামে পরিচিত । দুয়ার অঞ্চলের দক্ষিণে ভূমিভাগ যথেষ্ট সমতল হয়ে গেছে এবং এই অংশে বর্ষাকালে মাঝে মাঝে জলাভূমি অবস্থান করতেও দেখা যায় । আরও দক্ষিণে গঙ্গার প্রাচীন ব – দ্বীপ অঞ্চল যা প্লিসটোসেন উপযুগে গঠিত হয় এবং পরে উখিত ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে উচ্চ তরঙ্গায়িত সমভূমিরূপে অবস্থান করছে । এই সমভূমি বারিন্দ সমভূমি নামে পরিচিত ।
( ii ) ব – দ্বীপ অঞ্চলঃ গঙ্গার ব – দ্বীপ অঞ্চল বলিতে উহার দক্ষিণের সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের পলিগঠিত অঞ্চলকে বুঝায় । এই অঞ্চল এত নীচু ও সমতল যে সমুদ্রপৃষ্ঠ যদি ৬ মিটার উপরে উঠে তা হলে কলিকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল সম্পূর্ণরূপে সমুদ্রের জলে নিমজ্জিত হয়ে যাবে । এই অঞ্চলের উত্তরাংশে নদীগুলি মৃতপ্রায় এবং ইহাদের ব – দ্বীপ গঠনের কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে । কিন্তু দক্ষিণে মােহনার দিকে নদীগুলি ও তাহাদের শাখানদীগুলি এখনও যথেষ্ট সক্রিয় আছে । দক্ষিণের অংশে ব – দ্বীপ গঠনের কাজ এখনও সক্রিয়ভাবে চলছে । পৃথিবীর যে কোন বৃহৎ নদীর ব – দ্বীপ অঞ্চলের ন্যায় এখানেও সমুদ্রের নিকটবর্তী অংশে বিভিন্ন শাখানদী পরস্পরকে ছেদ করে জালের ন্যায় বিস্তার লাভ করেছে । নদীর মােহনায় অসংখ্য খাঁড়ি , দ্বীপ , চর ও লােনা জলাভূমি দেখতে পাওয়া যায় । গভীর জঙ্গলপূর্ণ ব – দ্বীপ অঞ্চলের দক্ষিণ প্রান্ত সুন্দরবন ’ নামে পরিচিত ।
( iii ) রাঢ় সমভূমিঃ ভাগীরথী – হুগলীর পশ্চিমে অবস্থিত নিম্নভূমি গঙ্গা ব – দ্বীপের অন্তভুক্ত না হলেও এটি যথেষ্ট সমতল । ঢেউ খেলানাে এই রাঢ় অঞ্চল পশ্চিমে ৫০ মিটার সমােন্নতিরেখা থেকে পূর্বে এবং দক্ষিণ – পূর্বে ভাগীরথী – হুগলীর তীরভাগ পর্যন্ত ঢালু হয়ে গেছে । পশ্চিমের ছােটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল থেকে আসা বাঁশলই , ব্রাহ্মণী , দ্বারকা , অজয় , দামােদর , শিলাই , দ্বারকেশ্বর , কংসাবতী প্রভৃতি নদীর দ্বারা বাহিত প্রাচীন পলল ও লাল দো – আঁশ মৃত্তিকা এবং কিছু কিছু নবীন পলল মৃত্তিকা সঞ্চিত হয়ে সমগ্র অঞ্চল গঠিত হয়েছে । বহুদিন ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার ফলে ভূমিভাগ মাঝে মাঝে ঢালু হয়ে গেছে । আবহবিকারে বহু স্থানে মৃত্তিকা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ল্যাটারাইট মৃত্তিকায় পরিণত হয়েছে ।

ঘ) ব্ৰহ্মপুত্ৰ সমভূমিঃ এই সমভূমি অঞ্চলও উত্তর ভারতের বিশাল সমভূমির অন্তভুক্ত । তিনদিক পর্বতবেষ্টিত এই সংকীর্ণ সমভূমি অঞ্চল ব্ৰহ্মপুত্র , সিসিরি , দিবাং এবং লুহিত ও অন্যান্য বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নদীর পলল সঞ্চিত হয়ে গঠিত হয়েছে । এই অঞ্চল উত্তর – পূর্ব থেকে দক্ষিণ – পশ্চিমে ঢালু হয়ে অবশেষে উত্তরবঙ্গ সমভূমিতে মিলিত হয়েছে ।