হিমালয়ের উৎপত্তি সম্পর্কে লেখ।

হিমালয় পর্বতশ্রেণী পৃথিবীর নবীনতম পর্বতশ্রেণীগুলির অন্যতম । এটি টার্সিয়ারী যুগের একটি ভঙ্গিল পর্বত । বর্তমানে যে অঞ্চলব্যাপী হিমালয় পর্বতমালা অবস্থিত , দশ কোটি বৎসর পূর্বে সেই অঞ্চলে একটি বিশাল সমুদ্র ছিল , যার নাম ছিল টেথিস ( Tethys ) । এর এক অংশ ভূমধ্যসাগররূপে আজও অবস্থান করছে । টেথিস সমুদ্রের উত্তরে ছিল কতকগুলি অতি প্রাচীন ভূখণ্ড ও পর্বত, যার নাম একত্রে ছিল অ্যাঙ্গারাল্যাণ্ড ( Angaraland )। দক্ষিণেও অনুরূপ কতকগুলি প্রাচীন ভূখণ্ড ছিল , যাদের একত্রে গন্ডোয়ানাল্যান্ড ( Gondwanaland ) বলা হত । টেথিস সাগরে দীর্ঘায়ত অবনমিত স্থান বা মহীখাতের ( জিওসিনক্লাইনের ) উভয় পার্শ্বে অবস্থিত এই দুই প্রাচীন ভূখণ্ড থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত দ্রব্যসমূহ পরিবাহিত হয়ে মহীখাত বা জিওসিনাইনটিকে ক্রমশঃ ভরাট করতে থাকে । পরে ভূ – আন্দোলনে গণ্ডোয়ানাল্যাণ্ড ও অ্যাঙ্গারাল্যাণ্ড পরস্পরের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার ফলে এই দুই প্রাচীন ভূখণ্ডের চাপে টেথিস সমুদ্র থেকে হিমালয়ের উৎপত্তি হয় ।

হিমালয় কিন্তু একটি ভূ – আন্দোলনেই গঠিত হয়নি । আজ থেকে প্রায় ৭ কোটি বৎসর পূর্বে টার্সিয়ারী যুগে হিমালয়ের সূচনা হয় । হিমালয় তিনটি ভূ আন্দোলনে গঠিত হয় । সর্বপ্রথম ভূ – আন্দোলনটি হয় ৪ কোটি বৎসর পূর্বে অলিগােসিন উপযুগে , যখন প্রবল ভূ – আন্দোলনে টেথিস অবতলে সঞ্চিত পাললিক শিলা ভাঁজ হয়ে উপরে উঠে পড়ে এবং তার সঙ্গে দাক্ষিণাত্য মালভূমির প্রাচীন রূপান্তরিত শিলা ও কঠিন গ্রানাইট শিলা , কুঞ্চিত পাললিক শিলার ফাটলের মধ্য দিয়ে উপরে উঠে এসে হিমগিরি বা হিমাদ্রি এবং টেথিস হিমালয়ের জন্ম দেয় । হিমগিরির উচ্চতা হিমালয় জন্মের পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেতে থাকায় এটি হিমালয়ের সর্বাপেক্ষা উচ্চ পর্বতরূপে অবস্থান করছে । হিমগিরি জন্মের প্রায় ১৪ কোটি বৎসর পরে , অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ২ কোটি বৎসর পূর্বে মধ্য মাইওসিন উপযুগে টেথিস অবতলে সঞ্চিত পলিমাটি দ্বিতীয় পর্যায়ে উপরে উঠে হিমাচল বা অবহিমালয়ের সৃষ্টি করে । হিমগিরি ও হিমাচলের ক্ষয়িত অংশ কালক্রমে হিমালয়ের পাদদেশে সঞ্চিত হয় এবং তাহা মাত্র ৭০ লক্ষ বৎসর পূর্বে মধ্য প্লাইস্টোসিন উপযুগে শিবালিক পাহাড়ে পরিণত হয় । দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভূ – আন্দোলন দুটির শক্তি অধিক থাকায় শিলাস্তরে যথেষ্ট ভাজ , রিকাম্বেণ্ট ভাজ , চ্যুতি , সংঘট্ট চ্যুতি , নাপ প্রভৃতির সৃষ্টি হয়েছে । কখনও কখনও চাপ এত বেশী হয়েছে যে , নিম্নে অবস্থিত প্রাচীন শিলাস্তর উপরে উঠে উপরের নবীন শিলাস্তরকে নিম্নে প্রােথিত করেছে । হিমালয়ের উত্তর পশ্চিমে নাঙ্গা পর্বতের নিকট এবং উত্তর – পূর্বে সাদিয়া পার্বত্য অঞ্চলে দুইটি বাঁক দেখতে পাওয়া যায় । ভূ – বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে , দাক্ষিণাত্যের কঠিন শিলাখণ্ড হিমালয়ের নরম শিলাস্তরের মধ্যে চাপ দেওয়ায় এই বাঁক দুইটির সৃষ্টি হয়েছে । হিমালয়ের শিলাস্তরে বহু জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর ছাপ ( জীবাশ্ম ) দেখতে পাওয়া যায় । যে কারণে অনুমান করা হয় যে , হিমালয় পর্বত এক সময় সমুদ্রের তলদেশে অবস্থিত ছিল । হিমালয় পর্বত কিন্তু এখনও খুব ধীরে ধীরে উপরে উঠছে , যা হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিকম্পের একটি প্রধান কারণ ।