প্রস্থ অনুসারে হিমালয়ের শ্রেণীবিভাগ কর।

প্রস্থ অনুসারে হিমালয়ের শ্রেণীবিভাগ মূলত চারপ্রকার । যথা -( ক ) শিবালিক বা বহিঃহিমালয় ( খ ) হিমাচল বা অবহিমালয় ( গ ) হিমাদ্রি বা উচ্চ হিমালয় এবং ( ঘ ) ট্রান্স বা টেথিস হিমালয় । নিচে এদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল –

( ক ) শিবালিক বা বহিঃহিমালয় ( Siwalik or Outer Himalaya) : হিমালয়ের দক্ষিণ প্রান্তে যে সকল ছােট ছােট পাহাড় সারিবদ্ধভাবে পশ্চিম থেকে পূর্বে বিস্তৃত রয়েছে , তাহাই শিবালিক হিমালয় নামে পরিচিত । এই শ্রেণী ১০ কিলোমিটার থেকে ৫০ কিলোমিটার চওড়া এবং এদের উচ্চতা ৬০০ মিটার থেকে ১,৫০০ মিটার । হিমালয় থেকে উদ্ভূত নদীগুলির দ্বারা বাহিত প্রস্তরখণ্ড ও পলিতে ভাজ পড়ে এই পর্বতের সৃষ্টি হয় । শিবালিক পাহাড় শিখরদেশ থেকে উত্তরে ক্রমশঃ নেমে গিয়ে চওড়া উপত্যকায় মিশেছে । এদের ‘ দুন ’ ( Dun ) বলে । এই উপত্যকাগুলি যথেষ্ট উর্বর এবং লােকবসতিও বেশ ঘন । এদের মধ্যে দেরাদুন – উপত্যকা বিশেষ উল্লেখযােগ্য । 

( খ ) হিমাচল বা অবহিমালয় ( Himachal or Middle Himalaya ): দক্ষিণে শিবালিক পাহাড় ও উত্তরে হিমাদ্রি ( হিমগিরি ) বা উচ্চ হিমালয়ের মধ্যে অবস্থিত ৩০ কিলোমিটার থেকে ৮০ কিলােমিটার প্রশস্ত এবং ২,০০০ থেকে ৩,৩০০ মিটার উচ্চ পর্বতশ্রেণীকে ‘ হিমাচল ’ নামে অভিহিত করা হয় । এই পর্বত অতি প্রাচীন জীবাশ্ম বিহীন রূপান্তরিত শিলাদ্বারা গঠিত । এই অংশে নদীগুলি গভীর খাতের সৃষ্টি করেছে । হিমাচলের চারটি প্রধান পর্বতশ্রেণী হল পিরপঞ্জল ( কাশ্মীর ) , ধাওলাধর বা ধবলাধর ( হিমাচল প্রদেশ ) , নাগটিব্বা ও মুসৌরী ( উত্তরাখণ্ড ) । 

( গ ) হিমাদ্রি ( হিমগিরি ) বা উচচ হিমালয় ( Himadri or Himgiri or Great Himalaya ): হিমাচল বা অবহিমালয় পর্বতের উত্তর প্রান্তে হিমালয়ের সর্বোচ্চ পর্বতশ্রেণী— হিমাদ্রি বা হিমগিরি অবস্থিত । ইহাদের গড় উচ্চতা ৬,০০০ মিটার হলেও স্থানে স্থানে এটি আরও অনেক উঁচু । এর দক্ষিণ ঢাল এত খাড়া যে একে সহজে অতিক্রম করা যায় না । হিমাদ্রি চিরতুষারাবৃত । হিমালয়ের উচ্চ গিরিশৃঙ্গ সমূহ এই পর্বতশ্রেণীর উপরেই অবস্থিত । নেপালে হিমাদ্রির উপর পৃথিবীর সর্বোচ্চ গিরিশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট ( ৮,৮৪৮ মিঃ ) এবং সিকিম হিমালয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা ( ৮,৫৯৮ মিঃ ) অবস্থিত । দার্জিলিং শহর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ও তাহার পার্শ্ববর্তী জানাে ও কাব্ৰু গিরিশৃঙ্গ মেঘমুক্ত দিবসে সুন্দর দেখতে পাওয়া যায় । হিমাদ্রির অন্যান্য উচ্চ গিরিশৃঙ্গ হল ধবলগিরি ( ৮,১৭২ মিঃ ) , গৌরীশঙ্কর ( ৭,৩৩২ মিঃ ) , নাজপর্বত ( ৮,১২৬ মিঃ ) , নন্দাদেবী ( ৭,৮১৭ মিঃ ) , মাকালু ( ৮,৪৮১ মিঃ ) , কামেট ( ৭,৭৫৬ মিঃ ) , বদ্রীনাথ ( ৭,১৩৮ মিঃ ) ইত্যাদি । হিমাদ্রি পর্বতশ্রেণী অতি প্রাচীন পাললিক ও রূপান্তরিত শিলা এবং তার মধ্যে অন্তঃপ্রবিষ্ট গ্রানাইট শিলা দ্বারা গঠিত । এই পর্বতশ্রেণী উত্তর – পশ্চিমে নাঙ্গাপর্বতের নিকট এবং উত্তর – পূর্বে সাদিয়ার নিকট চুলের কাটার ন্যায় ( hair pin bend ) বাঁক নিয়েছে ।

( ঘ ) ট্রান্স বা টেথিস হিমালয় ( Trans or Tethys Himalaya ): হিমাদ্রি পর্বতশ্রেণী উত্তরে সিন্ধু – সাংপাে উপত্যকা এবং আরও উত্তরে ক্রমশঃ তিব্বত মালভূমিতে গিয়া মিশেছে । এই অংশকে ট্রান্স বা টেথিস হিমালয় বলা হয় । এটি প্রায় ৪০ কিলােমিটার চওড়া এবং জীবাশ্মযুক্ত পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত । ভারতে এটি জম্মু – কাশ্মীর ও হিমাচল প্রদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ । জানসকর পর্বত ট্রান্স – হিমালয়ের প্রধান অংশ । এর সর্বোচ্চ গিরিশৃঙ্গ লিওপারগেল ( ৭,৪২০ মিঃ ) শতদ্রু নদীর উত্তরে শিপকিলা গিরিদ্বারের অপরদিকে অবস্থান করিতেছে ।
পামীর গ্রন্থি থেকে হিমালয় ব্যতীত অন্যান্য কতকগুলি পর্বতশ্রেণী বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়েছে । এদের মধ্যে হিন্দুকুশ , কারাকোরাম , কিউনলুন , তিয়েনসান , ট্রান্স – আলাই প্রভৃতি পর্বতশ্রেণী বিশেষ উল্লেখযােগ্য ।
পূর্ব প্রান্তে সাদিয়ার নিকট হিমালয় পর্বতশ্রেণী বাঁক নিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে ভারত ও মায়ানমারের সীমানার নিকট দিয়ে দক্ষিণে প্রসারিত হয়েছে । ভারতের এই অঞ্চলকে “ পূর্বাচল ’ বলা হয় ।