পশ্চিম হিমালয় সম্পর্কে লেখ।

সুউচ্চ পর্বতমালা , বরফাবৃত শৃঙ্গ , বন্ধুর ভূ – প্রকৃতি , পূর্ববর্তী নদী এবং উপত্যকা হিমবাহের শীর্ষদেশে বিস্তীর্ণ তুষারক্ষেত্র ইত্যাদি পশ্চিম হিমালয় জুড়ে প্রতিভাত হয় । Dr. S. P. Chatterjee পশ্চিম হিমালয় – কে নিম্নোক্ত চারটি ভাগে ভাগ করিয়াছেন । যথা – ক) উত্তর কাশ্মীর হিমালয় , খ) দক্ষিণ কাশ্মীর হিমালয় , গ) পাঞ্জাব হিমালয় এবং ঘ) কুমায়ুন হিমালয় । নিচে এগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল –

ক) উত্তর কাশ্মীর হিমালয়ঃ সিন্ধু নদ কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে তির্যকভাবে ৬৫০ কিলোমিটার পথ সংকীর্ণ উপত্যকা দিয়ে অতিক্রম করেছে । সিন্ধুর উত্তরে সুবিখ্যাত কারকোরাম পর্বতশ্রেণীর অবস্থান । এটি সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ও বিশাল হিমবাহ – অধ্যুষিত একটি অঞ্চল । এই হিমবাহগুলি থেকে বহু নদী উৎপন্ন হয়েছে । হিমালয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ K2 ( ৮,৬১১ মিটার ) বালটারাে হিমবাহের সীমানা থেকে উপরদিকে উঠে গেছে । ৫,৩০০ মিটার গড় উচ্চতাসম্পন্ন ভারতের সর্বোচ্চ মালভূমি লাদাখ কাশ্মীর হিমালয়ের উত্তর – পূর্বাংশ অধিকার করে আছে । চাঙ্গ চেনমো শৈলশ্রেণী লাদাখকে দুটি সুস্পষ্ট বিভাগে বিভক্ত করেছে । এই শৈলশ্রেণীর উত্তরে চাঙ্গ চেনমাে নদী সমতলপৃষ্ঠযুক্ত একটি অপ্রতিসম উপত্যকার মধ্য দিয়ে পশ্চিম বাহিনী হয়েছে ।

খ) দক্ষিণ কাশ্মীর হিমালয়ঃ ঝিলাম ও রাভি নদীর মধ্যবর্তী কাশ্মীর হিমালয়ের অন্তর্গত জম্মু পাহাড়শ্রেণী অত্যন্ত ব্যবচ্ছিন্ন এবং অধােভঙ্গ উপত্যকা প্রায়শঃ শৈলশিরার পৃষ্ঠদেশ অধিকার করেছে । দক্ষিণ প্রান্তে এরা প্রস্তরময় শুষ্ক ভূ – ভাগ “কান্দি” – অধ্যুষিত । পুঞ্চ পাহাড়শ্রেণী জম্মু পাহাড় শ্রেণীর পিছনে ৩০০ মিটার পর্যন্ত উঠে গেছে । এই পাহাড় বেলেপাথর ও শেল দ্বারা গঠিত । পিরপঞ্জল শৈলশ্রেণী প্রধান হিমালয় শ্রেণীর সাথে মিলিত হয় । পিরপঞ্জল শৈলশ্রেণী সমপ্রবণ ভাঁজ এবং সংঘট্ট চ্যুতির ফলে সৃষ্টি হয়েছে । বিখ্যাত বানিহাল গিরিপথ এই শৈলশ্রেণীকে অতিক্রম করেছে ।
কাশ্মীর উপত্যকা উত্তরে প্রধান হিমালয় পর্বতশ্রেণী এবং দক্ষিণে পিরপঞ্জলের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে । এটি একটি প্রায় সমতল ডিম্বাকৃতি পৃষ্ঠদেশ সমন্বিত উপত্যকা । উপত্যকার চারদিকে হ্রদ – সঞ্চিত পদার্থসমূহ বা কারেওয়া ( KAREWAS )  ধাপে ধাপে বন্টিত । এগুলি ঝিলাম ও এর উপনদীগুলি দ্বারা উপত্যকার মধ্যবর্তী অংশ থেকে অপসৃত হয়েছে ।
প্রধান হিমালয় পৃষ্ঠ কাশ্মীরের নাঙ্গা পর্বত ( ৪,১২৬ মিটার ) থেকে শুরু হয় । এটি অনেকগুলি অববাহিকা দ্বারা অধ্যুষিত ।

গ) পাঞ্জাব হিমালয়ঃ এই অঞ্চল বর্তমান হিমাচল প্রদেশে অবস্থান করায় এটি হিমাচল প্রদেশ হিমালয় ‘ নামেও পরিচিত । এই অঞ্চলের সর্ব দক্ষিণে আছে শিবালিক পর্বতমালা । এর দক্ষিণ ঢাল অধিক খাড়াই , কিন্তু উত্তরদিক ক্রমশঃ ঢালু হয়ে উপত্যকায় মিশেছে । এর গড় উচ্চতা ৬০০ মিটার । শিবালিকের উত্তরে হিমাচল বা অবহিমালয়ের চারটি পর্বত – ধাওলাধর , পিরপঞ্জল , নাগটি ও মুসৌরী অবস্থান করছে । এই পর্বতগুলির ঢাল খাড়া হওয়ায় জনবসতি কম এবং অরণ্যাবৃত । ধাওলাধর ও পিরপঞ্জল পর্বত দুটির উভয় পাশে কাংড়া , চম্বা , কুলু , লাহুল প্রভৃতি উপত্যকা অবস্থান করছে । শতদ্রু , বিপাশা ও ইরাবতী নদী তিনটি ধাওলাধর পর্বতকে বিভিন্ন স্থানে ছেদ করেছে । কাংড়া উপত্যকা ধাওলাধর পর্বতের দক্ষিণ পাদদেশে অবস্থিত । এটি অর্থনৈতিক কার্যকলাপে বিশেষ উন্নত এবং ঘন জনবসতিপূর্ণ । পিরপঞ্জলের মধ্য দিয়ে রোহটাং গিরিপথ ( ৪,৮০০ মিঃ ) উত্তরে লাহুল ও দক্ষিণে কুলু উপত্যকা দুটিকে যুক্ত করেছে । কুলু উপত্যকা আপেলের জন্য বিখ্যাত । ধাওলাধর পর্বতে উষ্ণ প্রস্রবণ আছে । ভবিষ্যতে এই অঞ্চল থেকে খনিজ তেল পাওয়ার সম্ভাবনা আছে । হিমাচল বা পাঞ্জাব হিমালয়ের দক্ষিণ – পূর্বে উত্তরাখণ্ডের সীমানায় নাগটিব্বা ও মুসৌরী পর্বত দুটি অবস্থান করছে । ধাওলাধর ও পিরপঞ্জলের উত্তরে উচ্চ হিমালয় ( ৫,০০০–৬,০০০ মিঃ ) পর্বত অবস্থিত । এই পর্বতের মধ্য দিয়ে কাংলা , বড়চালা প্রভৃতি গিরিপথ গেছে ।
একেবারে উত্তর – পূর্ব প্রান্তে জানসকর পর্বত স্পিটি ও কিনাউর উপত্যকাকে উত্তর পূর্বে অবস্থিত তিব্বত মালভূমি থেকে পৃথক করেছে । এই দুই পর্বতে বহু হিমবাহ দেখতে পাওয়া যায় । 
এই অঞ্চলের নদীগুলি সিন্ধু ও গঙ্গা উভয় নদী – উপত্যকাকেই জল সরবরাহ করে থাকে । নদীগুলির মধ্যে চন্দ্রভাগা , ইরাবতী , বিপাশা ও শতদ্রু নদী বিশেষ উল্লেখযােগ্য ।

ঘ) কুমায়ুন হিমালয় বা উত্তরাখণ্ড হিমালয়ঃ হিমালয়ের এই অংশের দক্ষিণ থেকে উত্তরে যথাক্রমে শিবালিক , হিমাচল ও হিমাদ্রি এই তিনটি পর্বতশ্রেণীই উত্তর – পশ্চিম থেকে দক্ষিণ – পূর্বে বিস্তার লাভ করেছে । সর্বদক্ষিণে শিবালিক পর্বত ৭৫০ মিটার হইতে ১,২০০ মিটার উচ্চ । এর দক্ষিণ ঢাল খুব খাড়াই , কিন্তু উত্তর ঢাল ক্রমশঃ নীচু হয়ে নিম্ন – উপত্যকায় মিশেছে । এই উপত্যকাগুলিকে ‘ দুন ’ বলে । এদের মধ্যে দেরাদুন সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ( ৩৬ কিঃ মিঃ দীর্ঘ ও ২৫ কিঃ মিঃ প্রশস্ত ) এবং উন্নত । অন্যান্য উপত্যকা গুলির মধ্যে কোটরি , চৌখাম্বা , পাট্টি , কোটা বিশেষ উল্লেখযােগ্য ।
দুন – উপত্যকাগুলির উত্তরে আছে হিমাচল পর্বতশ্রেণীর নাগটিব্বা ও মুসৌরী পর্বত । এটি ১,৫০০ মিটার থেকে ২,৭০০ মিটার উচ্চ এবং গড়ে প্রায় ৭৫ কিলােমিটার প্রশস্ত । এই পর্বতের পূর্বদিকে অনেকগুলি হ্রদ দেখতে পাওয়া যায় । এদের মধ্যে নৈনিতাল , ভীমতাল , নাউকুচিয়াতাল , সাততাল , পুনাতাল প্রভৃতি হ্রদ বিশেষ উল্লেখযােগ্য ।
হিমাচল পর্বতশ্রেণীর উত্তরে হিমাদ্রি বা উচ্চ হিমালয় পর্বতশ্রেণী অবস্থিত । এটি ৫০ কিলােমিটার প্রশস্ত এবং গড় উচ্চতা ৪,৮০০ মিটার থেকে ৬,০০০ মিটার । এই পর্বতশ্রেণীতেই নন্দাদেবী ( ৭,৮১৭ মিঃ ) , কামেট ৭,৭৫৬ মিঃ ) , বন্দরপুঞ্চ ( ৬,৩১৫ মিঃ ) , গঙ্গোত্রী ( ৬,৬১৪ মিঃ ) , কেদারনাথ ( ৬,৯৪০ মিঃ ) , চৌখাম্বা ( ৭,১৩৮ মিঃ ) , ত্রিশূল ( ৭,১২০ মিঃ ) , নন্দাকোট ( ৬,৮৬১ মিঃ ) প্রভৃতি তুষারাবৃত শৃঙ্গসমূহ অবস্থিত ।
হিমালয়ের এই অঞ্চল থেকে বহু নদীর উৎপত্তি হয়েছে । এই নদীগুলিকে গঙ্গা , যমুনা ও কালি – এই তিনটি নদী – বিন্যাসে ভাগ করা যায় ।