ভারতের লৌহ ইস্পাত শিল্পের সমস্যা আলােচনা কর।

লৌহ ইস্পাত শিল্পের সমস্যাঃ ভারতের লৌহ ইস্পাত শিল্পের প্রধান সমস্যা গুলি হল –
১. উৎকৃষ্ট মানের কোকিং কয়লার অভাবঃ ভারতে উন্নত মানের কোকিং কয়লার যথেষ্ট অভাব রয়েছে । বর্তমানে ভারতে উত্তোলিত কোকিং কয়লার ছাইয়ের পরিমাণ প্রায় ২৫ শতাংশ । তাই শিল্পজাত পণ্যের গুণগত মান এবং উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পায় । এর ফলে ভারতকে প্রতি বছর উচ্চ মানের কোকিং কয়লা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় ।
২. কাঁচামালের কেন্দ্রীভূত অবস্থানঃ ভারতের অধিকাংশ আকরিক লােহা ও কয়লার খনি ভারতের পূর্বদিকে ছােটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত । তাই এখানেই এই শিল্পের বিকাশ ঘটেছে এবং অন্যান্য শিল্পকেন্দ্রে কাঁচামাল আনার খরচ অনেক বেশি ।
৩. বিদ্যুৎশক্তির অভাবঃ অন্যান্য শিল্পের মতাে বিদ্যুৎশক্তির অভাব লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের উন্নতির ক্ষেত্রে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে । যেমন সাম্প্রতিককালে দামােদর উপত্যকা সংস্থা থেকে অপ্রতুল বিদ্যুৎশক্তির যােগানের কারণে SAIL- এর অধীনে থাকা শিল্পকেন্দ্রগুলিতে উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটেছে এবং হ্রাস পেয়েছে ।
৪. উৎপাদন ক্ষমতা পূর্ণমাত্রায় ব্যবহারের অভাবঃ ভারতের বৃহদায়তন লৌহ ও ইস্পাত শিল্পকেন্দ্রটির প্রতিটির মােট উৎপাদন ক্ষমতার একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যায় , ফলে মােট উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পায় ।
৫. পুরনাে মেশিনপত্রের ব্যবহারঃ অধিকাংশ লৌহ ও ইস্পাত কেন্দ্রে পুরনাে মেশিনপত্র ব্যবহার করে উৎপাদন হয় , যার ফলে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ কম হয় না , মানও বেশ খারাপ হয়ে থাকে ।
৬. অনুন্নত প্রযুক্তিবিদ্যাঃ অনুন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার জন্য শিল্পদ্রব্যের উৎপাদনে কাঁচামাল এবং শক্তি – দুটিই বেশি খরচ হয় , ফলে উৎপাদনের খরচ বেশি হয় এবং শিল্পজাত দ্রব্যের দামও বেড়ে যায় ।
৭. মান নিয়ন্ত্রণের অভাবঃ ভারতের ইস্পাত শিল্পে মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই , তাই বিশ্বের বাজারে এর তেমন কোনাে চাহিদাও নেই ।
৮. কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিঃ এই শিল্পের যাবতীয় কাঁচামাল এবং শক্তিসম্পদের মূল্য অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদনের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে ।
৯. অত্যধিক নিয়ন্ত্রণ ও ত্রুটিপূর্ণ পরিচালনাঃ সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন শিল্পকেন্দ্রগুলিতে নীতি নির্ধারণে যথেষ্ট দেরি হয় । তাছাড়া অনেক পরিকল্পনা ত্রুটিপূর্ণও থাকে । তাই এই শিল্পকেন্দ্রের উৎপাদন লাভজনক হওয়ার বদলে অনেক সময় ব্যয়বহুল হয়ে যায় ।
১০. শ্রমিক অসন্তোষঃ ভারতে সুলভ শ্রমিকের প্রাচুর্য থাকলেও দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে । তাছাড়া কেন্দ্রগুলিতে শ্রমিকের আধিক্য আছে এবং নানা কারণে শ্রমিক অসন্তোষের ফলে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে ।

সমস্যার সমাধানঃ ভারতের লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হিসাবে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে । যেমন –
১. লৌহ ও ইস্পাত কেন্দ্রগুলির আধুনিকীকরণ ও উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ।
২. ভারত সরকার নিজের অধীনস্থ লৌহ ও ইস্পাত কেন্দ্রগুলির উৎপাদন ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহারের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ।
৩. অলাভজনক কেন্দ্রগুলির পরিচালন ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে ।
৪. উৎপাদন বাড়ানাের জন্য সরকার বেসরকারি মালিকানায় দেশের বহু জায়গায় ‘ মিনি ’ ইস্পাতকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিচ্ছে ।
৫. এছাড়া সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ সুনিশ্চিত করা এবং শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণ করারও চেষ্টা করছে ।

ভবিষ্যত সম্ভাবনাঃ বর্তমানে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হলেও ভারতে লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল , কারণ –
১. লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের প্রয়ােজনীয় কাঁচামাল ও শক্তি সম্পদ ভারতে পাওয়া যায় ।
২. ভারতে যথেষ্ট উন্নত সড়কপথ ও রেলপথের যােগাযােগ ব্যবস্থা আছে ।
৩. ভারতের মতাে একটি বিপুল জনসংখ্যার দেশে অভ্যন্তরীণ বাজারে একটি ব্যাপক চাহিদা আছেই । এছাড়াও দক্ষিণ – পূর্ব এবং পশ্চিম এশিয়াতেও ইস্পাতজাত দ্রব্যের বিশাল বাজার রয়েছে ।
৪. ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার মাশুল সমীকরণ নীতি তুলে নেওয়ার ফলে ভারতীয় ইস্পাত শিল্পের যথেষ্ট সুবিধা হয়েছে ।