পূর্ব ভারতে অথবা, হুগলি নদীর উভয়তীরে পাট শিল্পের কেন্দ্রীভবনের কারণ লেখ।

আপাতভাবে পাট শিল্পের কেন্দ্রগুলি ভারতের পূর্বাঞ্চলে গড়ে উঠলেও বস্তুত দেশের মােট পাটকলের ৭৯ % পশ্চিমবঙ্গেই অবস্থিত । তাই পূর্ব ভারতে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া অন্যান্য রাজ্যে কয়েকটি পাট শিল্প বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে উঠলেও শিল্পের কেন্দ্রীভবন ঘটেছে হুগলি নদীর উভয় তীরে বাঁশবেড়িয়া থেকে দক্ষিণে বিড়লাপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে । এই অঞ্চলে ভারতে মােট চালু ৭৩ টি পাটকলের ৫৮ টি পাটকল অবস্থিত ।
কেন্দ্রীভবনের কারণঃ পূর্ব ভারতে অথবা, হুগলি নদীর উভয়তীরে পাট শিল্পের এইরকম কেন্দ্রীভবনের কারণ আলােচনা করা হল –
১. কাঁচামালের সহজলভ্যতাঃ পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতের মােট পাট উৎপাদনের ৬০ % আসে । পশ্চিমবঙ্গ ভারতের শ্রেষ্ঠ পাট উৎপাদক রাজ্য । হুগলি , নদীয়া , উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ – পরগনা , মুর্শিদাবাদ , বর্ধমান প্রভৃতি জেলাগুলিতে অনুকূল জলবায়ু ও মাটির জন্য প্রচুর পরিমাণে পাট উৎপাদন হয় যা এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল ।
২. শক্তি সম্পদের নৈকট্যঃ প্রাথমিক পর্যায়ে এই শিল্পের প্রয়ােজনীয় কাঁচামাল জ্বালানি কয়লা রাণীগঞ্জ থেকে আনা হত । বর্তমানে বিদ্যুৎশক্তি C.E.S.C. , টিটাগড় , কাশীপুর , মেটিয়াবুরুজ এবং রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদের ব্যান্ডেল , সাঁওতালডি , কোলাঘাট প্রভৃতি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি থেকে পাওয়া যায় ।
৩. আর্দ্র জলবায়ুঃ পাট শিল্প বয়ন শিল্পের অন্তর্গত বলে এখানকার আর্দ্র জলবায়ু এই শিল্পের অবস্থানের সহায়ক ।
৪. জলঃ হুগলি নদী এবং বিভিন্ন পৌরসভা থেকে পাট শিল্পের প্রয়ােজনীয় জল সংগ্রহ করা হয় ।
৫. উন্নত পরিবহন ব্যবস্থাঃ পূর্ব ভারত সারা ভারতের সঙ্গে উত্তম রেলপথ , বিমানপথ ও সড়ক পথের মাধ্যমে যুক্ত । বিশেষ করে কলকাতা বন্দর ’ এই অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় বিদেশের সঙ্গেও আমদানি ও রপ্তানির মাধ্যমে সুন্দর যােগাযােগ স্থাপিত হয়েছে । নদীর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ জলপথেও সহজে পরিবহন কার্য চালানাে হয় ।
৬. আমদানি – রপ্তানির সুবিধাঃ কলকাতা বন্দরের মাধ্যমে পাটজাত শিল্প বিদেশে রপ্তানি করা হয় ।
৭. সুলভ শ্রমিকঃ পাট শিল্পের জন্য প্রয়ােজনীয় দক্ষ শ্রমিক সুলভে প্রতিবেশী রাজ্যগুলি , যেমন – ওড়িশা , বিহার , ঝাড়খণ্ড প্রভৃতি রাজ্য থেকে পাওয়া যায় ।
৮. মূলধনের প্রাচুর্যঃ পাট শিল্পের জন্য প্রয়ােজনীয় মূলধন প্রাথমিক পর্যায়ে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছিল । বর্তমানে কলকাতার ধনী ব্যবসায়ী , বিভিন্ন অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান , রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ইত্যাদি থেকে ঋণ পাওয়া যায় ।
৯. চাহিদাঃ পাটজাত দ্রব্য তুলনামূলকভাবে সস্তা অথচ টেকসই । তাই প্যাকিং – এর জন্য বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা ব্যাপক ।
১০. ঐতিহাসিক কারণঃ প্রাথমিক পর্যায়ে পাট শিল্প কেন্দ্রগুলি ব্রিটিশদের উদ্যোগে এবং তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছিল যা এই শিল্পের অবস্থানের এক অন্যতম কারণ ।

পাট শিল্পের সমস্যাঃ
বর্তমানে পাট শিল্পে বিভিন্ন সমস্যা লক্ষ্য করা যায় । এগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল –
১. কাঁচামালের অভাবঃ দেশভাগের পর থেকেই পাট শিল্পে ধারাবাহিকভাবে কাঁচামালের অভাব রয়েছে । এছাড়া চাষীরা কাঁচা পাটের সঠিক দাম পায় না বলে পাট চাষ ক্রমশ কমিয়ে দিচ্ছে । ফলে কাঁচামালের আরাে অভাব দেখা দিচ্ছে ।
২. আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযােগিতাঃ বর্তমানে ভারতকে পাটজাত দ্রব্যের আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ , থাইল্যান্ড , মায়ানমার , জাপান , চীন , নেপাল প্রভৃতি রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযােগিতা করতে হয় । এছাড়া কিছু কিছু রপ্তানিকারক দেশে , যেমন – ফ্রান্স , জার্মানি , ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য প্রভৃতি জায়গায় পাট শিল্প গড়ে উঠেছে , এর ফলেও রপ্তানির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে ।
৩. পরিবর্ত দ্রব্যাদির আবির্ভাবঃ বর্তমানে পলিথিন , নাইলন , প্লাস্টিক ইত্যাদি আবিষ্কারের ফলে পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা পৃথিবীর বাজারে হ্রাস পেয়েছে ।
৪. পুরাতন যন্ত্রপাতির ব্যবহারঃ পাটকেন্দ্রগুলিতে এখনাে পুরাতন যন্ত্রপাতির সাহায্যে উৎপাদন করা হয় , ফলে দ্রব্যের মান খারাপ হচ্ছে এবং উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে । এর ফলে শিল্পটি অর্থনৈতিক দিক থেকে অলাভজনক হয়ে উঠেছে ।
৫. শ্রমিক – মালিক দ্বন্দ্ব: পাটকেন্দ্রগুলিতে শ্রমিক – মালিক বিরােধ এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা । এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয় ।
৬. অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহঃ পাটকলগুলিতে বিদ্যুতের যােগান অত্যন্ত অনিয়মিত । এর ফলেও মােট উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পায় ।
৭. অধিক রপ্তানি শুল্কঃ ভারতীয় পাটজাত দ্রব্যের রপ্তানি শুল্ক বেশি বলে বিশ্বের বাজারে এর দাম বেশি যা এই শিল্পের উন্নতির জন্য সহায়ক নয় ।

পাট শিল্পের সমস্যার সমাধানঃ ভারতীয় পাট শিল্পের সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য যে ব্যবস্থাগুলি অবলম্বন করা হয়েছে , তা আলােচনা করা হল –
১. কাঁচা পাটের অনিয়মিত সরবরাহের মূল কারণ হল কাঁচা পাটের দাম অস্বাভাবিক কম । তাই চাষীরা পাট চাষ কমিয়ে দিচ্ছে । এরজন্য ভারত সরকার ভারতীয় পাট নিগম ’ – এর মাধ্যমে প্রতিবছর সহায়ক মূল্যে পাট কিনে থাকে যা চাষীদের পাট চাষে উৎসাহিত করে ।
২. গবেষণার মাধ্যমে কাঁচা পাটের গুণগত মান উন্নয়ন ছাড়াও পাটকলগুলি থেকে মিশ্র দ্রব্য উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে ।
৩. পাটজাত দ্রব্যের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে তাদের মূল্য কমানাের চেষ্টা চলছে । এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বাড়বে ।
৪. পাটজাত দ্রব্যের রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানাের জন্য রপ্তানি শুল্ক কমানাে হয়েছে । এরজন্য ভারত সরকার ভারতীয় পাট শিল্প উন্নয়ন বাের্ড গঠন করেছে ।
৫. ভারত সরকার জাতীয় শিল্পোন্নয়ন নিগম এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি থেকে পাটকলগুলির পুনরুজ্জীবন এবং আধুনিকীকরণের জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ পাওয়ার বন্দোবস্ত করেছে ।
৬. এছাড়া , বিভিন্ন দ্রব্য , যেমন – সার , খাদ্যশস্য ইত্যাদি পরিবহনের জন্য আবশ্যিক বা আংশিকভাবে পাটজাত থলে ব্যবহারের নীতি সরকার গ্রহণ করেছে । এরজন্য দেশের বাজারে পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা বেড়েছে ।
৭. আন্তর্জাতিক বাজারেও পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধির প্রচারকার্য ইত্যাদি চালালে এই দ্রব্যের চাহিদা বাড়বে যা শিল্পের প্রসারের সহায়ক হবে ।

পাট শিল্পের সম্ভাবনাঃ পাট শিল্পের ভবিষ্যৎ খুবই সম্ভাবনাময় । তাই এই শিল্পের উন্নতির জন্য এর পুনরুজ্জীবন এবং আধুনিকীকরণের খুবই প্রয়ােজন । এরজন্য রুগ্‌ণ পাটকলগুলি বন্ধ করা প্রয়ােজন , যন্ত্রপাতিরও পরিবর্তন আবশ্যক । এছাড়া , এই শিল্পের প্রতিটি স্তরে ব্যবস্থাপনা যদি আরাে দৃঢ় করা যায় , তাহলেও এই শিল্পের পুনরুজ্জীবন সম্ভব । নতুন গবেষণার মাধ্যমে পাট থেকে আরাে উন্নতমানের কাপড় , চাদর , কার্পেট , ক্যানভাস ইত্যাদি নতুন উপকরণের উৎপাদন করার চেষ্টা চালানাে উচিত । যতই পরিবর্ত সামগ্রীর আবিষ্কার হােক , পাটজাত দ্রব্য তুলনামূলকভাবে সস্তা অথচ টেকসই বলে এই শিল্প নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হবে । তাই এই শিল্প থেকে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে এই শিল্পকে কখনাে অবহেলা করা উচিত নয় ।