ব্যাপক কৃষি কি?

সংজ্ঞাঃ যে কৃষিব্যবস্থায় কম কায়িক শ্রম ও বেশি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সাহায্যে তুলনামূলকভাবে একই সঙ্গে বিশাল পরিমাণ জমি চাষ করা হয় , তাকে ব্যাপক কৃষি বলে । জনসংখ্যা অনুপাতে কৃষিজমির পরিমাণ অনেক বেশি বলে ব্যাপক পদ্ধতিতে চাষ হয় । সাধারণত এইপ্রকার কৃষিব্যবস্থায় বাণিজ্যিক হারে ফসল উৎপন্ন হয়ে থাকে । জনসংখ্যার তুলনায় জমির পরিমাণ বেশি বলে এই কৃষিব্যবস্থায় দানাশস্যের চাষ হয় , তবে তা জীবিকাসত্তাভিত্তিক না হয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হয়ে থাকে । কৃষিজোতগুলি বড়াে হওয়ায় যন্ত্রপাতি ব্যবহারের দ্বারা উন্নত পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন করা হয় বলে উৎপাদনের হার অনেক বেশি , তাই খাদ্যের চাহিদার পরেও দানাশস্য প্রচুর পরিমাণে উদ্বৃত্ত থাকে । এই উদ্বৃত্ত ফসল বাজারে বিক্রির জন্য প্রেরিত হয় । নাতিশীতােষ্ণ অঞ্চলে ( উভয় গােলার্ধে ) ব্যাপক বাণিজ্যিক কৃষিব্যবস্থা অন্যান্য কৃষিব্যবস্থার সাথে আলাদা ও গুরুত্বপূর্ণ । সাধারণত এই কৃষিব্যবস্থায় বাণিজ্যিকভাবে গমচাষ হয়ে থাকে ।

অবস্থানঃ ব্যাপক কৃষিপদ্ধতি দেখা যায় মধ্য অক্ষাংশের নাতিশীতােষ্ণ অঞ্চলে , যেখানে বাণিজ্যিক হারে দানাশস্য উৎপাদন করা হয় । পৃথিবীর প্রধান ব্যাপক কৃষি – অঞ্চলসমূহ হল –
১. উত্তর আমেরিকার বাসন্তিক গম বলয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ডাকোটা , মন্টানা , মিনেসােটা এবং কানাডার ম্যানিটোবা , সাসকাচুয়ান ও আলবার্টায় বিস্তৃত ।
২. আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন শীতকালীন গম বলয়- প্রধানত ওয়াশিংটন , মন্টানা , উত্তর ডাকোটা , নেব্রাস্কা , টেক্সাস প্রভৃতি রাজ্যে বিস্তৃত ।
৩. আর্জেন্টিনার গম বলয়— দক্ষিণ আমেরিকার পম্পাস তৃণভূমির বিস্তীর্ণ কৃষিযােগ্যভূমি নিয়ে গঠিত ।
৪. মারে – ডালিং অববাহিকা , দক্ষিণ – পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া , নিউজিল্যান্ডের ক্যান্টারবেরি সমভূমি ।
৫. রাশিয়ার দক্ষিণাংশ , যা প্রায় সাইবেরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত । মূলত বাণিজ্যিক দানাশস্যের চাষ মধ্য – অক্ষাংশীয় অঞ্চলের একটি ক্রিয়া , যা উত্তর ও দক্ষিণ গােলার্ধের ৩০-৫৫ ° অক্ষাংশের মধ্যে গড়ে উঠেছে ।

বৈশিষ্ট্যঃ ব্যাপক কৃষি – র বৈশিষ্ট্যগুলি হল নিম্নরূপ –
১. বৃহৎ কৃষিক্ষেত্রঃ ব্যাপক বাণিজ্যিক দানাশস্যের কৃষিক্ষেত্রগুলি পৃথিবীতে সর্ববৃহৎ । জনসংখ্যার চাপ কম থাকায় প্রত্যেক কৃষক চাষ করার জন্য প্রচুর পরিমাণ জমি ক্রয় করতে পারে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫ লক্ষ খামার আছে । এই ৫ লক্ষ খামারে মােট জমির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি হেক্টর । গম – উৎপাদিত খামারের গড় ক্ষেত্রফল — উত্তর ডাকোটা ও কানাডা অঞ্চলে প্রায় ৫০০-১০০০ একর । আবার ওয়াশিংটনের অনেক খামার ২০০০ একরেরও হয়ে থাকে । কানসাসে এই খামারের ক্ষেত্রমান ৩৫০ একর ।
২. শস্যের বিশেষীকরণঃ বাণিজ্যিক দানাশস্যের উৎপাদনকারী কৃষকেরা অতিমাত্রায় বিশেষীকরণ পছন্দ করে । কৃষকেরা পশুপালনের পরিবর্তে একটিমাত্র শস্যের উপর মনােনিবেশ করে এবং প্রত্যেকে তাদের উপার্জনের প্রধান উৎস রূপে একটিমাত্র ফসলকে পছন্দ করে । বেশিরভাগ অঞ্চলে গমই হল প্রধান ও একমাত্র পছন্দসই দানাশস্য । এই বিশেষীকরণ অ্যাংলাে – আমেরিকার প্রধান বৈশিষ্ট্য । অনুকূল পরিবেশে এই অঞ্চলে গম চাষ ব্যাপকভাবে হয়ে থাকে ।
৩. যন্ত্রপাতির ব্যবহারঃ ব্যাপক বাণিজ্যিক কৃষিব্যবস্থার মতাে অন্য কোনাে কৃষিব্যবস্থায় যন্ত্রপাতির এত ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায় না । এই কৃষি সম্পূর্ণভাবে যন্ত্রনির্ভর । এই যন্ত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল – ট্রাক্টর , হার্ভেস্টার , থ্রেসার প্রভৃতি । ৮০ % -এরও বেশি কৃষকের নিজস্ব ট্রাক্টর আছে । মাটি কোপানাে , বীজ বােনা , সার ও কীটনাশক প্রয়ােগ ( হেলিকপ্টারের সাহায্যে ) শস্য কাটা , শস্য ঝাড়াই , গুদামজাত করা ইত্যাদি প্রতিটি কাজের জন্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় ।
৪. শ্রমশক্তিঃ যেকোনাে খামারের শ্রমশক্তির পরিমাণ কমই থাকে , ব্যতিক্রম শুধু শস্যাবর্তনের সময়টুকু । এই সময় বহু সংখ্যায় শ্রমিক ভাড়া করতে হয় । তবে বছরের বাকি সময় কৃষি শ্রমিকের বদলে ভারী কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারই বহাল থাকে ।
৫. মূলধন বিনিয়ােগঃ কৃষি – যন্ত্রপাতি , জলসেচ ও অন্যান্য কৃষি – পরিসেবার জন্য প্রচুর মূলধন বিনিয়ােগ করা হয় ।
৬. সংগঠিত কৃষি ব্যবস্থা ও প্রতিটি কৃষি – খামার উন্নত কৃষি – যন্ত্রপাতি , পরিবহন ব্যবস্থা , কম্পুটার , ইন্টারনেট সংযােগ ইত্যাদিতে স্বয়ং সম্পূর্ণ । তাই এই কৃষি ব্যবস্থা সুসংগঠিত ।
৭. মাথাপিছু উৎপাদন বেশি কিন্তু একরপ্রতি উৎপাদন কমঃ জমি সরবরাহের প্রাচুর্য , শ্রমিকের অভাব , প্রযুক্তিবিদ্যার ব্যবহার , শস্যের বিশেষীকরণ প্রভৃতির জন্য কৃষকেরা শস্যের রপ্তানির জন্য সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ফসল উৎপাদন করে থাকে । জনসংখ্যা কম হওয়ায় মাথাপিছু উৎপাদন বেশি কিন্তু একর প্রতি উৎপাদন কম হয় । বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি করে শ্রমিকের অভাব পূরণ করা হয়েছে । ফলে , বাণিজ্যিক গমক্ষেত্রগুলিতে প্রচুর পরিমাণে গম উদ্বৃত্ত হয়েছে ।
৮. কর্মবিনিয়ােগ কাঠামোঃ বাণিজ্যিক কৃষি অঞ্চলের অধিকাংশ শহর ও নগর মূলত পরিসেবা ক্ষেত্র । এই সব জনপদের অধিবাসীরা গাড়িতে বস্তা বােঝাই , যন্ত্রপাতি মেরামত , খামারের কাজ , আর্থিক ও অন্যান্য পরিসেবার সাথে যুক্ত ।
৯. বাজারের প্রভাবঃ ইউরােপ ও আমেরিকায় প্রধান খাদ্যরূপে গম ব্যবহৃত হয় । পৃথিবীর বেশির ভাগ গম অঞ্চলগুলি এই দুটি বলয়ের সাথে যুক্ত । এই দুই অঞ্চলে মানুষের খাদ্যের জন্য যেমন গম ব্যবহৃত হয় , তেমনি পশুখাদ্যের জন্য ভুট্টা ও যব ব্যবহৃত হয় । এশিয়ার দেশগুলিতে জনসংখ্যার চাপ বেশি হওয়ায় খাদ্যসমস্যা ব্যাপক । এই সমস্যা মেটানাের জন্য গম বলয় থেকে গম এই সকল দেশে রপ্তানি করা হয় ।