ধান চাষের অনুকূল ভৌগােলিক পরিবেশ লেখ।

পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষের খাদ্যশস্য হল ধান । ধান মৌসুমী অঞ্চলের ফসল বলে ধানের চাষ দক্ষিণ – পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ । এর বাইরে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে খুব সামান্য ধানই জন্মে থাকে । ধান চাষের অনুকূল ভৌগােলিক পরিবেশগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় – ( ক ) প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ( খ ) অর্থনৈতিক পরিবেশ । নিচে এদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল –

( ক ) প্রাকৃতিক পরিবেশঃ
১. জলবায়ুঃ ধান ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলের ফসল , তাই ধান চাষে প্রচুর উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের প্রয়ােজন হয় । (a) উষ্ণতাঃ ধান চাষের জন্য উপযােগী উষ্ণতা হল গড়ে ১৭০ সেলসিয়াস থেকে ২৭০ সেলসিয়াস । তবে অধিক উষ্ণতায় ধান দ্রুত পাকে । (b) বৃষ্টিপাতঃ ধান চাষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাতের প্রয়ােজন হয় । গড়ে ১০০ সে.মি. থেকে ২০০ সে.মি. বৃষ্টিপাত ধানচাষের পক্ষে উপযুক্ত । বৃষ্টিপাত কম হলে জলসেচ করতে হয় । ধানের চারা যখন বড় হয় তখন বেশি বৃষ্টিপাত হলে ধান পুষ্ট হয় কিন্তু ধান পাকার সময় বৃষ্টিপাত হলে শস্যহানির আশঙ্কা থাকে ।
২. মৃত্তিকাঃ উর্বর মৃত্তিকা ধান চাষের জন্য উপযােগী । তবে উপযুক্ত উষ্ণতা , সার ও জলের সরবরাহ থাকলে যে কোনাে মাটিতে ধান চাষ হয় । নদী অববাহিকা ও ব – দ্বীপ অঞ্চলের উর্বর পলিমাটিতে ধান সবচেয়ে ভাল জন্মায় । কাদাযুক্ত দো – আঁশ মাটিতে ধান চাষ ভাল হয় কারণ এই মাটিতে ধানের শিকড় প্রবেশ করতে পারে এবং এইরকম মাটির জলধারণের ক্ষমতা বেশি ।
৩. ভূমিরূপঃ ধান চাষের প্রথম পর্যায়ে চারাগাছের গােড়ায় জল দাঁড়িয়ে থাকা বাঞ্ছনীয় । সেক্ষেত্রে সমতল জমি হওয়া আবশ্যক , যেখানে বাঁধ দিয়ে জল ধরে রাখা সুবিধাজনক । তবে পার্বত্য অঞ্চলেও ধান চাষ করা হয় – ধাপ কেটে জমি সমতল করে । পৃথিবীর অধিকাংশ ধানজমি নদী অববাহিকার প্লাবনভূমি ও ব – দ্বীপ অঞ্চলের জলাভূমিগুলিতে অবস্থান করছে । 

( খ ) অর্থনৈতিক পরিবেশঃ
১. শ্রমিকঃ ধান চাষে যন্ত্রের ব্যবহার সীমিত । ধান চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করা , আগাছা পরিষ্কার করা , বীজ বপন ও চারা রােপণ করা , শস্য সংগ্রহ করা ইত্যাদির জন্য প্রচুর দক্ষ ও সুলভ শ্রমিক প্রয়ােজন । ঘনবসতিপূর্ণ মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলে শ্রমিকের প্রাচুর্য ধান চাষকে উন্নতিলাভ করতে সাহায্য করেছে ।
২. পরিবহনঃ উচ্চ ফলনশীল বীজ , কীটনাশক , রাসায়নিক সার , কৃষিযন্ত্রপাতি ইত্যাদি সংগ্রহ বা ফসল ( উদ্বৃত্ত ) বাজারে পাঠানাে ইত্যাদির জন্য প্রয়ােজনীয় উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা থাকলে চাষীদের সুবিধা হয় ।
৩. চাহিদাঃ ধান মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলের প্রধান খাদ্যশস্য বলে এর অন্তর্গত সমস্ত অঞ্চলেই ধানের চাহিদা বেশি । ফলে এই অঞ্চলে ধানের চাষ প্রাধান্য পায় ।
৪. মূলধনঃ নিবিড় পদ্ধতিতে ধানের উৎপাদন বাড়ানাের জন্য কৃষি – যন্ত্রপাতির ব্যবহার কম হলেও উচ্চ ফলনশীল বীজ , কীটনাশক , রাসায়নিক সার এবং শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন প্রভৃতির জন্য যথেষ্ট মূলধনের প্রয়ােজন হয়ে থাকে ।