গম চাষের অনুকূল ভৌগােলিক পরিবেশ লেখ।

মানুষের অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্য হল গম । প্রাচীনকাল থেকেই গমের ব্যবহার চলে আসছে । সঠিক তথ্য জানা না গেলেও গম চাষের সূত্রপাত ভূমধ্যসাগরের পূর্বদিকে ইউরােপের কোনাে একটি স্থানেই ঘটেছিল । গম বাণিজ্যিক ফসল হিসাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ । গম প্রধানত নাতিশীতােষ্ণ মণ্ডলের শস্য , তবে অধিক শীত ও উষ্ণ জলবায়ুতেও গম উৎপন্ন হয় । গম চাষের উপযুক্ত ভৌগােলিক অবস্থান হল উত্তর গােলার্ধে ২০° থেকে ৬৬° উত্তর অক্ষাংশ এবং দক্ষিণ গােলার্ধে ২০° থেকে ৪৫° দক্ষিণ অক্ষাংশ । গম চাষের জন্য অনুকূল ভৌগােলিক পরিবেশগুলিকে দু’ভাগে ভাগ করা যায় । যথা – ( ক ) প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ( খ ) অর্থনৈতিক পরিবেশ । নিচে এগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল –

( ক ) প্রাকৃতিক পরিবেশঃ
১. জলবায়ুঃ গম শীতল ও নাতিশীতােষ্ণ অঞ্চলের কম বৃষ্টিপাতযুক্ত স্থানের ফসল । গম চাষে মাটির চেয়ে জলবায়ুর প্রভাব অনেক বেশি । (a) উষ্ণতাঃ সাধারণভাবে গম চাষের জন্য ১৪° -১৯° সেলসিয়াস গড় উষ্ণতা আদর্শ । তবে গম চাষের প্রথম অবস্থায় শীতল ও আর্দ্র আবহাওয়া এবং পরে ফসল কাটার সময় উষ্ণ এবং শুষ্ক রৌদ্রজ্জ্বল আবহাওয়ার প্রয়ােজন । (b) বৃষ্টিপাতঃ শীতল ও নাতিশীতােষ্ণ অঞ্চলের মাঝারি থেকে অল্প বৃষ্টিপাতযুক্ত স্থানে গম চাষ হয় । গমের বীজ থেকে অঙ্কুর বের হওয়া এবং পুষ্টিসাধনের জন্য ৫০ – ১০০ সে.মি. বৃষ্টিপাতের প্রয়ােজন । তবে ১০০ সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে গম চাষের ক্ষতি হয় । শীতকালীন গম চাষের জন্য ৪০ সেন্টিমিটারের কম বৃষ্টিপাত হলেও চলে । (c) তুষারপাতঃ গম চাষের জন্য তুষারপাত ক্ষতিকারক । গম জন্মানাের জন্য কমপক্ষে ১০০ টি তুষারমুক্ত দিনের প্রয়ােজন । বর্তমানে এমন অনেক গমের বীজ আবিষ্কার হয়েছে যা বপনের তিন মাসের মধ্যে ফসল বুনে , পাকিয়ে ও কেটে ঘরে তােলা যায় ।
২. মৃত্তিকাঃ গম চাষের জন্য উর্বর ভারী দো – আঁশ মাটি বিশেষ উপযােগী । তৰে জলসেচের সুব্যবস্থা থাকলে উর্বর নরম মাটি , খড়িমাটি বা বেলেমাটিতেও গম চাষ করা যায় ।
৩. ভূমিরূপঃ জল নিকাশি ব্যবস্থাসহ প্রায় সমতল বা অল্প ঢালু এবং উঁচু জমি গম চাষের পক্ষে উপযুক্ত । বর্তমানে বেশিরভাগ কৃষিজমিতেই আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয় । তাই গম চাষের জমি বেশি চালু হলে বা আয়তন ছােট হলে যন্ত্রপাতি ব্যবহারে অসুবিধা দেখা দেয় ।

( খ ) অর্থনৈতিক কারণঃ
১. শ্রমিকঃ গম চাষে ভূমি কর্ষণ , বীজ বপন , শস্য কর্তন – সমস্ত কাজই এখন বেশিরভাগই যন্ত্রের সাহায্যে করা হয় । তাই খুব বেশি শ্রমিকের প্রয়ােজন হয় না । তবে অনুন্নত দেশগুলিতে যন্ত্রের ব্যবহার কম হওয়ায় সুলভ শ্রমিক অপরিহার্য ।
২. মূলধনঃ আধুনিক কৃষিপদ্ধতিতে গম চাষ হয় বলে অর্থাৎ কৃষি যন্ত্রপাতি , উচ্চ ফলনশীল বীজ , উৎকৃষ্ট সার , কীটনাশক , জলসেচ এবং শ্রমিকদের মজুরির জন্য প্রচুর মূলধন লাগে ।
৩. পরিবহনঃ গম সাধারণত বাণিজ্যিক হারে উৎপন্ন হয় , তাই পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত হওয়া প্রয়ােজন , যাতে কৃষিক্ষেত্র ও বাজারের মধ্যে যােগসূত্র গড়ে ওঠে ।
৪. চাহিদাঃ গম বাণিজ্যিক ফসলের অন্তর্গত , তাই স্থানীয় বাজার ছাড়াও সারা বিশ্বে এর চাহিদা রয়েছে ।