কৃষির অর্থনৈতিক গুরুত্ব লেখ ।

পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে , যেখানে বিশেষ কোনাে শিল্প নেই । কিন্তু পৃথিবীতে এমন কোনাে দেশ নেই , যেখানে ভূমি কর্ষিত হয় না , অর্থাৎ , কৃষিকাজ হয় না । প্রাথমিকভাবে কৃষিকাজ যে কোনাে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির বুনিয়াদ । একারণে , কৃষির অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম । নীচে কৃষির অর্থনৈতিক গুরুত্ব উল্লেখ করা হল –

১. মানুষের অপরিহার্য দ্রব্যের জোগানঃ মানুষের জীবনধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্য হল খাদ্য ও পানীয় , বস্ত্র এবং আশ্রয় । কৃষিক্ষেত্র থেকে মানুষ জীবনধারণের মূল উপকরণ— কার্বোহাইড্রেট , স্নেহ ও প্রােটিন জাতীয় খাদ্য পায় । বিভিন্ন খাদ্যশস্য , যেমন— ধান , গম , জোয়ার , মিলেট এবং শাকসবজি , ফল – মূল , মাছ – মাংস , দুধ , ডিম ইত্যাদি প্রােটিন খাদ্য কিংবা চা কফি ইত্যাদি পানীয় কৃষিক্ষেত্র জোগান দেয় । জনসংখ্যার উত্তরােত্তর বৃদ্ধির ফলে এই সব খাদ্যের চাহিদা বেড়েছে । আধুনিক কৃষি পদ্ধতির সাহায্যে এইসব খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদনের সঙ্গে জোগানও বৃদ্ধি পেয়েছে । পরিধেয় বস্ত্র ও বাড়ি ঘর নির্মাণের উপকরণ ( তুলা , পাট , বাঁশ কাঠ , খড় ইত্যাদি ) কৃষিক্ষেত্র থেকেই পাওয়া যায় ।

২. পশুখাদ্যের জোগানঃ মিশ্র কৃষি – ব্যবস্থায় উন্নত পদ্ধতিতে পশুপালন করা হয় । পশুখাদ্যের উৎপাদন ও জোগানের উপর উন্নত পশুপালন নির্ভর করে । উন্নত দেশগুলি পশুখাদ্যের জন্য জমিতে যব , ভুট্টা , জোয়ার , বাজরা , আলফালফা , ক্লোভার , হে প্রভৃতি শস্য চাষ করে । উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলিতে জনসংখ্যার চাপ বেশি থাকায় কৃষিজমিতে প্রধানত খাদ্যশস্য ও অর্থকরী শস্যের চাষ হয় ।

৩. কৃষিকাজ শিল্পের কাঁচামালের উৎসঃ কার্পাস – বয়ন শিল্প , পাট শিল্প , চা শিল্প , কফি শিল্প , ভােজ্য তেল উৎপাদন শিল্প , খাদ্য – প্রক্রিয়াকরণ শিল্প প্রভৃতি কৃষিনির্ভর । ফলে , কৃষিনির্ভর শিল্পগুলির উন্নতির ক্ষেত্রে কৃষিকাজের গুরুত্ব অপরিসীম ।

৪. সহযােগী শিল্পের উন্নতিতে কৃষির ভূমিকাঃ কৃষিকে ঘিরে অন্যান্য বহু শিল্পের বিকাশ ঘটেছে । যেমন- রাসায়নিক সার শিল্প , কীটনাশক ও আগাছানাশক দ্রব্য উৎপাদন শিল্প , ট্রাক্টর , হারভেস্টর , পাম্প সেট ইত্যাদি যন্ত্রশিল্পের বিকাশ ঘটেছে । ফলে , কৃষির উন্নতির সঙ্গে শিল্পের প্রসারও ঘটেছে ।

৫. কৃষিকাজ কর্মসংস্থানের উৎসঃ প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে বহু মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল । উন্নত দেশ অপেক্ষা উন্নয়নশীল দেশগুলির ( ভারত , বাংলাদেশ , পাকিস্তান , শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি ) অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের দ্বারা জীবিকানির্বাহ করে । বর্তমানে ভারতে প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষ কৃষিতে নিযুক্ত আছে ।

৬. কৃষিকাজ জাতীয় আয়ের উৎসঃ অধিকাংশ দেশের মােট জাতীয় আয়ের একটি বিরাট অংশ কৃষিক্ষেত্র থেকে আসে । বর্তমানে ভারতের মােট জাতীয় আয়ের ৩০ ৩৫ শতাংশ কৃষি ও কৃষি – সংশ্লিষ্ট উৎপাদন থেকে আসে ।

৭. বাণিজ্যের প্রসার ও বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনঃ উদ্বৃত্ত কৃষিজাত দ্রব্য বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটায় । এর থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন হয় , যা দেশের অর্থনৈতিক ভিতকে সুদৃঢ় করে । অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলে মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হয় ।

৮. গবেষণামূলক কাজের সুযােগ বৃদ্ধিঃ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষি – উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়ােজনীয়তা দেখা দিয়েছে । এজন্য উন্নত প্রথায় চাষ – আবাদের জন্য কৃষি – গবেষণার কাজে বহু মানুষ নিযুক্ত আছে । গবেষণা থেকে উচ্চফলনশীল বীজ , সংকর পদ্ধতি, উন্নত ও পরিবেশবান্ধব কীটনাশক প্রভৃতি আবিষ্কৃত হয়েছে ।