উদ্যান কৃষি বা হরটিকালচার কি?

সংজ্ঞাঃ মূলত বাজারে বিক্রির জন্য সবজি , ফল , ফুলের নিবিড় চাষের পদ্ধতি উদ্যান কৃষি বা হরটিকালচার (Horticulture) নামে পরিচিত ।

উল্লেখযোগ্য কৃষি অঞ্চলঃ হরটিকালচারের সর্বোচ্চ বিকাশ দেখা যায় উত্তর – পশ্চিম ইউরােপে । এখানকার লন্ডন ও প্যারিস মহানগরীর প্রাত্যহিক চাহিদার কৃষিদ্রব্যাদির যােগান আসে টেমস্ ও প্যারিস অববাহিকার বাগানগুলি থেকে । এই অঞ্চলগুলির অনুকূল আবহাওয়ার জন্য ফসল তাড়াতাড়ি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় । অত্যন্ত দূর থেকে পরিবাহিত হয়ে আসায় এই ফসলগুলির পরিবহন ব্যয় তথা বিক্রয়মূল্যও খুব বেশি হয় । ইউরােপের ও মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের অন্যত্র হরটিকালচারের বিকাশ ঘটেছে প্রকৃতপক্ষে সেখানকার জলবায়ু ও মৃত্তিকার উপরে ভিত্তি করে । উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় নেদারল্যান্ডের কথা , এখানকার লেভেন থেকে হার্লেম পর্যন্ত এক বিস্তীর্ণ অংশে ফুলের চাষ অত্যন্ত প্রসিদ্ধি লাভ করেছে । প্রধানত বাসন্তিক ফুল , যেমন — টিউলিপ , লিলি , পদ্ম প্রভৃতির এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক উৎপাদন হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এদের চাহিদা অত্যন্ত বেশি । অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হ্রদ অঞ্চলেও শহরতলির খামারগুলির থেকে মহানগরগুলিতে শাকসবজি ও ফুল – ফল রপ্তানি করা হয় । প্রধানত নাতিশীতােয়ুমণ্ডলের কৃষিব্যবস্থা হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে নাগরিক সভ্যতার ক্রমবর্ধমান চাহিদার জন্য হরটিকালচার ধীরে ধীরে নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলেও বিকাশলাভ করছে । নিরক্ষীয় অঞ্চলের উচ্চভূমিগুলি , যেখানে আবহাওয়া অপেক্ষাকৃত শীতল , সেই সব স্থানে খামারগুলি গড়ে তুলে সেখান থেকে প্রত্যহ নিম্ন সমভূমির উম্নতর আবহাওয়ার শহরতলিগুলিতে কৃষিদ্রব্যাদি প্রেরণ করা হয় । যেমন — মালয়েশিয়ার ক্যামেরুন উচ্চভূমির খামারগুলি । আধুনিক শীততাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিরক্ষীয় অঞ্চলে এই কৃষির বিকাশে অত্যন্ত সহায়তা করেছে ।

উদ্যান কৃষি বা হরটিকালচারের ব্যবস্থাসমূহঃ এই কৃষিপদ্ধতির ব্যবস্থাগুলি নিম্নরূপ –
১. সারা বছর ফোটে এমন ফুলের চাষ ছাড়াও মরশুমি ফুলের চাষ এবং পাতাবাহারি গাছের চাষ করা হয় । এই ফুলের চাষকে ফ্লোরিকালচার বলে ।
২. সারা বছর পাওয়া যায় , এমন মরশুমি ফল , যেমন – আম , কলা , আঙুর , কমলালেবু , পেয়ারা , পেঁপে প্রভৃতির চাষ করা হয় , যাকে পোমামকালচার বলে ।
৩. শাকসবজির চাষের ক্ষেত্রেও একই ধারার প্রবর্তন দেখা যায় , যাকে ওলেরিকালচার বলে , যাতে বাজারকেন্দ্রিকতা দেখা যায় ।
৪. প্রাকৃতিক পরিবেশের ভিন্নতার দিকে তাকিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ফলের চাষ করা হয় ।
৫. ফলগুলি চাষের ক্ষেত্রে সেই সমস্ত ফলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় , যেগুলি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে ।
৬. বিভিন্ন প্রকার ফল থেকে মানুষের ব্যবহার্য নানারকম সামগ্রী প্রস্তুত হয় । যেমন — জ্যাম , জেলি , আচার ছাড়াও বিভিন্ন ফলের রস থেকে , ( আঙুর থেকে বিশ্ববিখ্যাত সুরা বা মদিরা ( মদ্য স্যাম্পেন ’ ) প্রস্তুত হয় ।
৭. রােগী , বয়স্ক মানুষ ও বাড়ন্ত ছেলেমেয়েদের খাদ্যতালিকার দিকে তাকিয়ে হরটিকালচারে সেই ধরনের ফল অথবা সবজির চাষ করা হয় ।
৮. এক্ষেত্রে এমন কিছু ফলের চাষ করা হয় , যেগুলি মানুষের শরীরে ওষুধ হিসেবে কাজ করে । সেইসব ফল খেয়ে মানুষের দ্রুত আরােগ্য লাভ ঘটে ।

উদ্যান কৃষি বা হরটিকালচারের বৈশিষ্ট্যঃ এই কৃষিব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ –
১. খামারগুলিতে অত্যন্ত নিবিড় পদ্ধতিতে কৃষিকার্য করা হয় এবং প্রায়শই জলসেচের ব্যবস্থা থাকে । অনেক সময় কাচের ঘরে বা গ্রিন হাউসে ( Green house ) শাকসবজির চাষ করা হয় , যাতে বাইরের অত্যাধিক শৈত্যে ফসলের কোনােরূপ ক্ষতি না হয় । 
২. খামারগুলি সাধারণত ক্ষুদ্রায়তনের হয় এবং শহরের সাথে অত্যন্ত জাত পরিবহন ও যােগাযােগ ব্যবস্থার দ্বারা যুক্ত থাকে । 
৩. শাকসজীর নিয়মিত চাষের জন্য জমির উর্বরতা বজায় রাখা একান্ত প্রয়ােজন । এই কারণে শস্যাবর্তন ছাড়াও নির্দিষ্ট পরিমাণে জৈব ও অজৈব সার ব্যবহার করা হয় । 
৪. হরটিকালচারে যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সুযােগ থাকলেও ক্ষুদ্রায়তন জমি ও নিবিড় পদ্ধতিতে চাষবাসের জন্য কায়িক শ্রমকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয় । ফলে অসংখ্য কৃষক এই ব্যবস্থার সাথে যুক্ত থাকে । 
৫. সর্বোচ্চ ফলন ও অতিরিক্ত মুনাফার জন্য খামার বা বাগানগুলিকে অত্যন্ত দক্ষতা ও নিপুণতার সাথে বৈজ্ঞানিক কৃষি পদ্ধতির সাহায্যে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় । শস্যবীজ নির্বাচন , কীটনাশকের ব্যবহার , নার্সারির পরিকাঠামাে নির্মাণ , গ্রিনহাউসের ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম উষ্ণতা বৃদ্ধির বন্দোবস্ত প্রভৃতির সঠিক অবস্থান একটি হরটিকালচার বাগানের গড়ে ওঠার অন্যতম পূর্বশর্ত । এই কারণে কৃষিতে পুঁজির বিনিয়ােগের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি হওয়া প্রয়ােজন ।