সিন্ধুকর্দম বা সিন্ধুমল কি? এর শ্রেণীবিভাগ কর।

গভীর সমুদ্রের সমভূমি এবং সমুদ্রখাতের সঞ্চয়কে সমুদ্রের গভীরতম অংশের সঞ্চয় বলা হয় । এখানকার অজৈব সঞ্চয়ের মধ্যে নিমজ্জিত আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত দ্রব্যসমূহ প্রধান । আগ্নেয়গিরি নির্গত সূক্ষ্ম উপাদান থেকে লােহিত কর্দম বা লাল কাদার সৃষ্টি হয় বলে এখানে প্রধানত লাল কাদাই দেখা যায় । জৈব উপাদান সমুদ্রের গভীরতম অংশের অপর একটি প্রধান সঞ্চয়জাত পদার্থ । তিমি , হাঙর ও অন্যান্য বড়াে সামুদ্রিক প্রাণীর দেহাবশেষ থেকে জৈব পদার্থের সৃষ্টি হয় । এখানে সামুদ্রিক প্রাণীর দেহাবশেষের চুন ও সিলিকা জাতীয় পদার্থের বেশির ভাগ সঞ্চিত হওয়ার আগেই জলে দ্রবীভূত হয়ে যায় । অবশিষ্টাংশ দেখতে তরল ও পিচ্ছিল কাদার মতাে হয় বলে একে সিন্ধুকর্দম বা সিন্ধুমল ( ooze ) বলে । সিন্ধুমল একমাত্র সমুদ্রের গভীরতম অংশে দেখা যায় । গভীর সমুদ্রের জৈব উপাদানের এই সঞ্চয়কে পিলেজিক সঞ্চয়ও ( pelagic deposits ) বলা হয় । সমুদ্রের গভীরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সিন্দুমলের সঞ্চয় কমে যায় । 

শ্রেণীবিভাগঃ সিন্ধুমলকে উপাদান অনুসারে দুটি ভাগে ভাগ করা যায় , যেমন — চুনজাতীয় সিন্ধুমল এবং বালুকাজাতীয় সিমল । নিচে এই দুইপ্রকার সিন্ধুমল সম্পর্কে আলোচনা করা হল –
ক) চুনজাতীয় সিন্ধুমল ( Calcareous Ooze ) : যে সিন্ধুমলে চুনজাতীয় পদার্থের আধিক্য থাকে তাকে চুনজাতীয় সিন্ধুমল বলে । এটি দুই প্রকারের হয় । যথা – 
১. টেরােপড সিন্ধুমল ( Pteropod Ooze ) : মােচাকৃতির চুনজাতীয় জৈব সঞ্চয়কে টেরােপড সিন্ধুমল বলে । এ জাতীয় সিন্ধুমলে ভাসমান শামুক , ঝিনুক ইত্যাদি মােচাকৃতি সামুদ্রিক প্রাণীর দেহাবশেষ বেশি সঞ্চিত হয় । এতে প্রায় ৪০ শতাংশে ক্যালশিয়াম কার্বনেট থাকে । গভীর সমুদ্রের যে অংশে সমুদ্রজলের উষ্ণতা অপেক্ষাকৃত বেশি সেখানে এ জাতীয় সঞ্জয় বেশি দেখা যায় । যেমন — আটলান্টিক মহাসাগরের চ্যালেঞ্জার ও ডলফিন উচ্চভূমিতে এবং অস্ট্রেলিয়ার পূর্বাংশের অগভীর প্রশান্ত মহাসাগরে টেরােপড সিন্ধুমল বেশি দেখা যায় । সাধারণত ৬০০ মিটার থেকে ২০০০ মিটার গভীরতায় এটি বেশি সঞ্চিত হয় ।
২. গ্লোবিজারিনা সিন্ধুমল ( Globigerina 0oze ): যে চুনজাতীয় সিন্ধুমল গ্লোবিজারিনা নামক ছােটো ছােটো কীটাণুর দেহাবশেষ থেকে সৃষ্টি হয় তাকে গ্লোবিজারিনা সিন্ধুমল বলে । উপকূলের কাছে এ জাতীয় সিন্ধুমলের রং ধুসর , কিন্তু গভীর সমুদ্রে তা সাদা হয় । গ্লোবিজারিনা সিন্ধুমলে প্রায় ৬৪ শতাংশ ক্যালশিয়াম থাকে । এ জাতীয় সিন্ধুমলের সঞ্চয় ক্রান্তীয় ও নাতিশীতােষ্ণ আটলান্টিক মহাসাগরে , ভারত মহাসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম মহিসােপান অঞ্চলে এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বভাগে দেখা যায় । 

খ) বালুকাজাতীয় সিন্ধুমল ( Siliceous 0oze ): এ জাতীয় সিন্ধুমলে বালুকাজাতীয় পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে বলে একে বালুকাজাতীয় সিন্ধুমল বলে । এটি দু – প্রকারের হয় । যথা – 
১. রেডিয়েলারিয়ান সিন্ধুমল ( Radiolarian Ooze ): গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী রেডিয়েলারিয়া এবং ফোরামিনিফেরা নামক কীটের দেহ থেকে নির্গত সূক্ষ্ম লালার মতাে পদার্থ কঠিন হয়ে বালুকণার মতাে পদার্থে পরিণত হয় । এ জাতীয় কঠিন পদার্থ জলে দ্রবীভূত হয় না । সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম প্রাণীর দেহ থেকে নির্গত লালা থেকে সৃষ্ট বালুকণা দ্বারা গঠিত সিন্ধুমলকে রেডিয়ােলারিয়ান সিন্ধুমল বলে । বালুকাজাতীয় পদার্থের আধিক্য থাকলেও ৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ চুনজাতীয় পদার্থ থাকে । তবে গভীরতা বৃদ্ধির ফলে চুনজাতীয় পদার্থের পরিমাণ হ্রাস পায় । ক্রান্তীয় অঞ্চলে মহাসাগর ও সমুদ্রে রেডিয়ােলারিয়ান সিন্ধুমল দেখা যায় ।
২. ডায়াটম সিন্ধুমল ( Diatom Ooze ): গভীর সমুদ্রতলে বসবাসকারী অতি ক্ষুদ্র ডায়াটম উদ্ভিদের দেহাবশেষ থেকে নিঃসৃত বালুকাজাতীয় পদার্থ সঞ্চিত হয়ে ডায়াটম সিন্ধুমল গঠিত হয় । এ জাতীয় সঞ্চয়ে বালুকার সঙ্গে অল্প পরিমাণে কাদা ও চুনজাতীয় ( ৩ – ৩০ শতাংশ ) পদার্থও থাকে । উপকূলের কাছে ডায়াটম সিন্ধুমলের রং নীল এবং গভীর সমুদ্রে হলুদ বা হালকা হলুদ রঙের হয় । উচ্চ অক্ষাংশের গভীর সমুদ্রে ডায়াটম সিন্ধুমলের সঞ্চয় বেশি দেখা যায় । আন্টার্কটিকা মহাদেশের চারদিকে এবং প্রশান্ত মহাসাগরে আলাস্কা থেকে জাপান পর্যন্ত অংশের ১২০০ মিটার থেকে ৪০০০ মিটার গভীরে এ জাতীয় সঞ্চয় বেশি দেখা যায় ।