তরঙ্গ বিযুক্তি কয়প্রকার ও কি কি?

সাধারণত ভূ – অভ্যন্তরের মধ্য দিয়ে যখন ‘ P ‘ ও ‘ S ‘ তরঙ্গের প্রবাহ ঘটে , তখন আলােকতরঙ্গের মতাে প্রতিফলন ও প্রতিসরণ ঘটে । অর্থাৎ এক ঘনত্বের শিলাস্তর থেকে অন্য ঘনত্বের স্তরে প্রবাহের সময় ‘ P ‘ ও ‘ S ‘ তরঙ্গের গতিপথ পরিবর্তিত হয় , একে বিযুক্তি ( Discontinuity ) বলে । এই বিযুক্তি তরঙ্গের গতির ওপর নির্ভর করে । তরঙ্গের গতি আবার পদার্থের ভৌত ধর্মের উপর নির্ভর করে । এভাবে প্রতিফলন ও প্রতিসরণের কোণের মান থেকে ভূ – অভ্যন্তরের পদার্থের বৈশিষ্ট্য জানা যায় । তাছাড়া ভূকম্পন তরঙ্গ বিভিন্ন স্তরের বিযুক্তিগুলির সীমারেখা চিনতে সাহায্য করে । প্রধান কয়েকটি বিযুক্তি হল নিম্নরূপ –

১. মােহােরােভিসিক বিযুক্তি ( Mohorovisic discontinuity ): ভূ – অভ্যন্তরের এইরকম প্রথম বিচ্যুতি ধরা পড়ে মহাদেশে ৩৫ কিমি গভীরতায় এবং সমুদ্রতলে ৫ – ১০ কিমি গভীরতায় । এই পরিবর্তন বা বিযুক্তির কারণ ভূত্বক থেকে গুরুমণ্ডলের ঘনত্বের উল্লেখযােগ্য বৃদ্ধি । এই পরিবর্তন প্রথম লক্ষ করেন যুগােস্লাভিয়ার ভূ – বিজ্ঞানী এ মােহােরাভিসিক । তার নামে এই বিযুক্তিতলের নাম হয় মােহােরােভিসিক বিযুক্তিতল ( Mohorovisic discontinuity ) ।
বৈশিষ্ট্যঃ এর বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ –
ক) এটি ভূত্বক ও গুরুমণ্ডলের সীমারেখা নির্দেশক ।
খ) এখানে উভয় তরঙ্গের গতিবেগ কিছুটা বেড়ে যায় ।
 
২. গুটেনবার্গ বিযুক্তি ( Gutenberg discontinuity ): ভূকম্পের গতিতে অনুরুপ আর একটি বিযুক্তিতল লক্ষ করা যায় ২৯০০ কিমি নীচে । জার্মান বিজ্ঞানী গুটেনবার্গ এই বিযুক্তিতলকে চিহ্নিত করেন বলে এর নাম গুটেনবার্গ বিযুক্তিতল ( Gutenberg discontinuity ) ।
বৈশিষ্ট্যঃ এর বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ –
ক) এই অংশে S তরঙ্গের প্রবাহ বিলুপ্ত হয় এবং P তরঙ্গের গতিবেগ কমে যায় ।
খ) এটি প্রকৃতপক্ষে গুরুমণ্ডল এবং কেন্দ্রমণ্ডলের সীমানা – নির্দেশক ।

৩. লেম্যান বিযুক্তি ( Lehman discontinuity ): ভূত্বকের ৫১৫৫ কিমি গভীরতায় হঠাৎ করে ‘ P তরঙ্গের গতিবেগ বাড়তে দেখা যায় । ডাচ ভূ – বিজ্ঞানী আই , লেম্যান ( I. Lehman , 1971 ) -এর নামানুসারে একে লেম্যান বিযুক্তি ( Lehman discontinuity ) বলে ।
বৈশিষ্ট্যঃ এর বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ –
ক) এটি প্রকৃতপক্ষে কঠিন অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল এবং তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলের সীমারেখা ।
খ)  ভূত্বকের প্রায় ৫১৫৫ কিমি গভীরতায় এটির উপস্থিতি বোঝা যায় ।

৪. কনরাড বিযুক্তি ( Conrad discontinuity ): ভূত্বকের সিয়াল ও সিমা স্তরের সংযােগস্থলে এই বিযুক্তি অবস্থিত । অস্ট্রিয়ার বিজ্ঞানী ভি . কনরাড ( V. Conrad ) , ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে এর পরিচিতি ঘটান এবং তাঁর নামানুসারে একে কনরাড বিযুক্তি ( Conrad discontinuity ) বলা হয় ।
বৈশিষ্ট্যঃ এর বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ –
ক) এটি প্রকৃতপক্ষে হালকা গ্রানাইট এবং ভারী ব্যাসল্ট শিলার সীমারেখা ।
খ) ‘ P ‘ তরঙ্গের গতিবেগ এখানে হঠাৎ করে সেকেন্ডে ৬ কিমি থেকে প্রায় ৬.৫ কিমিতে পরিণত হয় ।
গ) মহাদেশে এই বিযুক্তিতলের অবস্থান ১৫ – ২০ কিমি নীচে । সমুদ্রতলে এটি অনুপস্থিত ।