শহরের কর্মভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ

অবস্থান , পরিপ্রেক্ষিত ও কার্যাবলি — পরস্পর সম্পর্কযুক্ত । এদের কোনােটিই এককভাবে নয় , বরং তিনটির মিলিত কারণেই কোনাে শহর বা নগর গড়ে ওঠে । কোনাে শহরের কার্যাবলি সেই শহরের অবস্থানের আপেক্ষিক সুবিধা ও অসুবিধার উপর নির্ভরশীল । সাধারণভাবে বলা যায় , ব্যবসাবাণিজ্য সব শহরেরই কার্যাবলির অন্তর্গত । কিন্তু , ব্যাবসাবাণিজ্য ছাড়াও প্রতিটি শহরের কতকগুলি সুনির্দিষ্ট কার্যাবলি থাকে , যা তাদের প্রত্যেককে স্বীয় বৈশিষ্ট্য প্রদান করে । বিভিন্ন প্রকার মুখ্য কার্যাবলির ওপর নির্ভর করে , শহরের কর্মভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ করা হয় । যেমন— 
১. প্রশাসনিক শহরঃ শাসনতান্ত্রিক কাজকর্মের সুবিধাযুক্ত স্থানে রাজধানী শহর , জেলা শহর , মহকুমা শহর ইত্যাদির সৃষ্টি হয় এবং এদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় , পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি হয় । বিদ্যুৎ , জল সরবরাহ ও টেলিযােগাযােগ ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয় , এবং বিচারব্যবস্থা গড়ে ওঠে । 

২. প্রতিরক্ষা – সংক্রান্ত শহরঃ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কাজকর্মের ওপর নির্ভর করে অনেক শহর গড়ে ওঠে । প্রতিরক্ষা – সংক্রান্ত উপকরণ নির্মাণের কারখানা যেখানে গড়ে ওঠে , সেখানে সেনাবাহিনীর প্রয়ােজনে শিক্ষা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র , উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা । গড়ে ওঠে । এইসব শহরে সেনাবাহিনীর থাকার ব্যবস্থা , প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা , বিমান – অবতরণ ক্ষেত্র , যুদ্ধ – জাহাজের জন্য পােতাশ্রয় ইত্যাদির সুবিধা থাকতে পারে । পাঁচমাড়ি ভারতের একটি উল্লেখযােগ্য প্রতিরক্ষা শহর ।

৩. সাংস্কৃতিক শহরঃ কোনাে কোনাে শহর সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের জন্য সমধিক পরিচিত হয় । যেমন — ইংল্যাণ্ডের কেমব্রিজ , ভারতের শান্তিনিকেতন বিশ্ববিখ্যাত । শিক্ষাভিত্তিক শহরগুলিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ভবন এবং সংলগ্ন গ্রন্থাগার , খেলার মাঠ ছাড়াও ছাত্র – শিক্ষকদের প্রয়ােজনে রকমারি দোকানপাট , বিশেষত পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র , খেলাধুলার সরঞ্জাম , পােশাক – পরিচ্ছদের দোকান ইত্যাদি গড়ে ওঠে । 

৪. পণ্যদ্রব্য সংগ্রহ শহরঃ খনিজ – উত্তোলক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে , মৎস্য – আহরণকারী বন্দরের নিকটবর্তী অঞলে বা কাষ্ঠ সংগ্রাহক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যে শহর গড়ে ওঠে , তাকে এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা হয় । দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের স্বর্ণখনি অঞ্জলে , স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলির ( নরওয়ে , সুইডেন ও ফিনল্যান্ড ) বন্দর – সংলগ্ন অঞলে , কানাডা , আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশের কাষ্ঠ – সংগ্রাহক অঞলে এ – জাতীয় শহর গড়ে উঠতে দেখা যায় ।

৫. উৎপাদন শহরঃ যে সমস্ত শহরের কার্যাবলির মধ্যে যন্ত্রযােগে শিল্পজাত পণ্য উৎপাদন করা প্রধান কার্য , সেই সমস্ত শহরগুলি এই পর্যায়ভুক্ত । শিল্পবিপ্লবের সময় এই শহরগুলির সংখ্যা দ্রুতহারে বৃদ্ধি পায় । ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ার– কার্পাসবস্ত্র – উৎপাদন কেন্দ্র হিসাবে বিখ্যাত । ভারতের জামশেদপুর ইস্পাত নগর নামে পরিচিত । 

৬. পণ্যসমূহের বণ্টন শহরঃ যে সকল শহরের মুখ্য কার্যাবলি হল পরিবহন এবং উৎপাদিত অথবা সংগৃহীত পণ্যসমূহের বণ্টন , সেই সমস্ত শহর এই পর্যায়ভুক্ত । টোকিও , নিউইয়র্ক , লন্ডন , কলকাতা , সিঙ্গাপুর , হংকং — এ জাতীয় শহরের উদাহরণ ।

৭. পর্যটন শহরঃ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে এ – জাতীয় শহর গড়ে ওঠে । এই সমস্ত শহরে আগত পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা , অত্যাধুনিক সুযােগ – সুবিধাযুক্ত হােটেল , বাজার ইত্যাদি সৃষ্টি হয় । কুলু , মানালি — এরকম শহরের উদাহরণ ।

৮. বসতি শহরঃ এমন অনেক শহর দেখা যায় , যে সমস্ত স্থানে স্থানীয় বাসিন্দাদের বাসগৃহের পরিমাণ সর্বাধিক । সড়কপথ , রেলপথ এবং বাসগৃহের সংখ্যাই এ – জাতীয় শহরে বেশি ।

৯. ধর্মীয় শহরঃ ধর্মীয় কার্যকলাপের ওপর নির্ভর করেও বড়াে শহর গড়ে ওঠে । যেমন — হরিদ্বার , জেরুজালেম , মক্কা ইত্যাদি ।