মিশ্র কৃষি

পরিচিতিঃ মিশ্র কৃষি হল পৃথিবীর উন্নত দেশগুলির সর্বাধুনিক কৃষিব্যবস্থা । প্রধানত উত্তর – পশ্চিম ইউরােপ , উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূল , সি আই এসের কিছু অংশ এবং অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে এই কৃষিব্যবস্থা বিকাশলাভ করেছে । মিশ্র কৃষি সম্পূর্ণভাবেই প্রগাঢ় বা নিবিড় কৃষিব্যবস্থা এবং বিশেষীকরণ ( Specialization ) – এর জন্য চিহ্নিত । কৃষিখামারগুলিতে একদিকে যেমন কৃষকেরা খাদ্যশস্যের চাষ করে । অন্যদিকে তেমনি বাগানের থেকে ফুল – ফল সংগ্রহ করে , কিছু জমিতে পশুপালন করে এবং কিছু জমিতে উৎপন্ন দ্রব্য বিক্রয়যােগ্য পণ্যে পরিণত করার কেন্দ্র বা কারখানা চালনা করে । কিছু কিছু স্থানে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মৎস্যচাষ ও জমিতে গুটিপােকা বা রেশমের চাষও করা হয় । আমেরিকার কিছু কিছু খামারে পশুখাদ্যও উৎপাদন করা হয় । প্রকৃতপক্ষে মৃত্তিকার গুণাগুণ , জলবায়ু , জমির আয়তন , মূলধনের পরিমাণ ও সর্বোপরি বাজারের চাহিদা বুঝে মিশ্র কৃষিব্যবস্থা পরিচালনা করা হয় । 

বৈশিষ্ট্যঃ মিশ্র কৃষিব্যবস্থার কয়েকটি উল্লেখযােগ্য বৈশিষ্ট্য নিম্নে উল্লেখ করা হল – 
( ১ ) মিশ্র কৃষিব্যবস্থায় এক – ফসলি ব্যাপক কৃষির মতাে অধিক মুনাফার সুযােগ না থাকলেও কৃষক সারা বছর নির্দিষ্টভাবে উপার্জন করতে পারে ।
( ২ ) সাধারণভাবে বাণিজ্যিক কৃষিব্যবস্থা হলেও কৃষক নিজের প্রয়ােজনেও কিছু কিছু উৎপাদন করে থাকে ।
( ৩ ) একাধিক ফসলের চাষ হওয়ায় বাজারে কোনাে একটি বিশেষ শস্যের মূল্য হ্রাস পেলেও কৃষক অন্যান্য ফসলের মাধ্যমে সেই ক্ষতি পূরণ করে নিতে পারে , ফলে কৃষককে কোনাে বড় রকম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয় না । 
( ৪ ) অত্যন্ত উন্নত বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ও দক্ষ কৃষকদের দ্বারা সম্পূর্ণ উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালিত হয় । 
( ৫ ) শস্যাবর্তন পদ্ধতির মাধ্যমে মৃত্তিকার উর্বরা – শক্তি বজায় রাখা হয় । এছাড়া প্রচুর পরিমাণে জৈব ও অজৈব সারও ব্যবহার করা হয় । 
( ৬ ) মিশ্র কৃষি ব্যবস্থায় উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়ের জন্য সুষ্ঠ পরিবহন ব্যবস্থা , দক্ষ সাংগঠক ও উপযুক্ত বাজার থাকা প্রয়ােজন , যা উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সর্বদা পাওয়া যায় না । 
( ৭ ) মিশ্র কৃষি ব্যবস্থা সবরকম জলবায়ুতে ও ভৌগােলিক পরিবেশে গড়ে ওঠার উপযােগী নয় । 
( ৮ ) কৃষকদের বিভিন্ন কৃষি – বিষয় , প্রযুক্তি ও বাজারের গতি প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়ােজন , যা এশিয়া , দক্ষিণ আমেরিকা বা আফ্রিকার কৃষকদের প্রায় নেই বললেই চলে । 
( ৯ ) মিশ্র কৃষি ব্যবস্থায় অসংখ্য ফসল উৎপাদিত হয় , যার সবগুলিরই স্থানীয় বা নিকটবর্তী বাজারে চাহিদা থাকে না , ফলে কৃষককে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় ।
(১০) মিশ্র কৃষি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ডেয়ারি শিল্প । ইউরােপের নেদারল্যান্ড , ডেনমার্ক , ব্রিটেন , সুইজারল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ – পূর্ব অংশ ও নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডের নিকটে এই ডেয়ারি শিল্প বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে । প্রধানত নিকটবর্তী বড় শহর ও মহানগরগুলির চাহিদা পূরণের জন্য এই শিল্প গড়ে উঠলেও বর্তমানে এখান থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে দুগ্ধজাত ও মাংসজাত পণ্য রপ্তানি করা হয় । প্রধান রপ্তানি দ্রব্যগুলি হল চীজ , মাখন , ঘি , গুঁড়াে দুধ , মাংস , বিভিন্ন ধরনের ডিম প্রভৃতি । এই অঞ্চলের পােলট্রি শিল্পগুলিও উল্লেখযােগ্য । 
(১১) মিশ্র কৃষির অপর একটি উন্নত ও পরিবর্ধিত রূপ লক্ষ করা যায় উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলে । এই অঞ্চলে বৃহৎ বৃহৎ কারখানায় গবাদি পশু ও হাস , মুরগি প্রভৃতি পালন করা হয় ও একই ছাদের নিচে পশুজাত দ্রব্য সংগ্রহ থেকে পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয় । একে বলা হয় ফ্যাক্টরি ফার্মিং ( Factory Farming ) । পশুদের খাদ্যেরও ব্যবস্থা করা হয় কৃত্রিমভাবেও তাদেরকে রােগের হাত থেকে বাঁচাতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয় । 
(১২) সমগ্র প্রক্রিয়াটি চালনা করতে প্রচুর মূলধন প্রয়ােজন হয় । বর্তমানে এই কৃষি পদ্ধতি অত্যন্ত উন্নতি লাভ করেছে ।
উপরের বৈশিষ্ট্যগুলি পর্যালােচনা করলে বােঝা যায় যে সর্বাধুনিক ও সর্বোন্নত কৃষিব্যবস্থা হওয়া সত্ত্বেও কতগুলি সীমাবদ্ধতার কারণে মিশ্র কৃষি ব্যবস্থা পৃথিবীর কয়েকটি মাত্র নির্দিষ্ট অঞ্চলেই বিকাশলাভ করেছে ।