স্থানান্তর কৃষি ব্যবস্থা

পরিচিতিঃ স্থানান্তর কৃষি ব্যবস্থা একটি আদিম কৃষি ব্যবস্থা। এই কৃষি ব্যবস্থায় জংগল পুড়িয়ে পরিস্কার করে চাষ করা হয় এবং কয়েক বছর পর ওই জমির উর্বরতা কমে গেলে তা পরিত্যাগ করে অন্যত্র একইভাবে চাষ করা হয়। এই প্রকার কৃষি ব্যবস্থাকে স্থানান্তর কৃষি বলা হয়। একে ক্ষেত্রান্তরী কৃষিব্যবস্থাও বলে ।  স্থানান্তর বা যাযাবরী কৃষিকাজ হল বাস্তুসংস্থানগত কৃষিব্যবস্থার আদি রূপ । এই কৃষিব্যবস্থা প্রধানত ক্লান্তীয় বৃষ্টিবহুল জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্গত আফ্রিকা , ক্রান্তীয় দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় এবং দক্ষিণ – পূর্ব এশিয়ার আদিম জাতিদের মধ্যে প্রচলিত আছে । এই কৃষিপদ্ধতিতে কেবল নিজেদের পরিবারের সদস্যদের জীবনধারণের প্রয়ােজনে কৃষিকাজ করা হয় । খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৪০০০ বছর আগে থেকে , অর্থাৎ নিওলিথিক সময় থেকে প্রচলিত আছে ।

অবস্থানঃ এশিয়া ও আফ্রিকার অনুন্নত দেশগুলোতে এবং আমেরিকা মহাদেশের কিছু কিছু দেশে এই কৃষি ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়। যেমন –
১. উত্তর পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশে ঝুম
২. শ্রীলঙ্কায় চেনা
৩. মালয়েশিয়ায় লাডাং
৪. ইন্দোনেশিয়ায় হুমা ৫. ফিলিপাইনে কেইনজিন
৬. মায়ানমারে তংগিয়া
৭. থাইল্যান্ডে তামরাই
৮. ব্রাজিলে রোকা
৯. ভেনেজুয়েলায় কোনুকা
১০. মধ্য আমেরিকায় মিলপা
১১. কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে মাসোলে

বৈশিষ্ট্যঃ স্থানান্তর কৃষি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ-
১. এই কৃষিব্যবস্থায় পর পর তিন – চার বছর অন্তর জমি বদল করা হয় । কারণ , জমির উর্বরতা অনেকটাই কমে যায় ।
২. কৃষিজোতগুলি আকৃতিতে অনেক ছােটো হয় ( 0.5-1 হেক্টর ) । ব্যক্তি মালিকানার পরিবর্তে গােষ্ঠী – মালিকানা বলবৎ হয় ।
৩. বাসস্থান থেকে কিছুটা দূরে বনভূমির অংশবিশেষ পরিষ্কার করে বা পুড়িয়ে চাষের জমি প্রস্তুত করা হয় ।
৪. যাযাবর শ্রেণির মানুষজন বা উপজাতি গােষ্ঠীভুক্ত লােকজন এ জাতীয় চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে ।
৫. কৃষিকাজে আদিম ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় ।
৬. আগুনে – পােড়া উদ্ভিদের ছাই ছাড়া অন্য কোনাে জৈব ও রাসায়নিক সার জমিতে ব্যবহার করা হয় না ।
৭. কৃষিক্ষেত্রগুলি লােকালয় থেকে অনেক দূরে , প্রত্যন্ত কোনাে মালভূমি বা পাহাড়ি অঞ্চলে গহন অরণ্যের মধ্যে গড়ে ওঠার ফলে আধুনিক কৃষির কোনাে ধ্যানধারণা উপজাতীয় মানুষদের মধ্যে নেই ।
৮. এই কৃষিতে বাণিজ্যের জন্য কোনাে উদ্বৃত্ত ফসল থাকে না , অর্থাৎ সম্পূর্ণ জীবিকাসত্তাভিত্তিক ।
৯. এই কৃষিব্যবস্থায় ভারী ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার একেবারেই হয় না । তবে মাটি কোপানাে বা জমি প্রস্তুত ও ফসল কাটার জন্য ফলা , কাস্তে , প্রভৃতি প্রাচীন যন্ত্রপাতির ব্যবহার করা হয় ।
১০. এই কৃষিপদ্ধতিতে যে পরিমাণ মনুষ্যশ্রম ব্যবহৃত হয় , তার তুলনায় ফসল খুব কম উৎপাদিত হয় । উৎপাদিত ফসলের বেশির ভাগই নিম্ন শ্রেণির ( ধান , গম , বাজরা , ট্যাপিওকা , কাসাভা , কলা প্রভৃতি ) ফসল উৎপাদিত হয় ।
১১. এই কৃষি থেকে উৎপাদিত কৃষিজ দ্রব্য প্রতিটি উপজাতি গােষ্ঠীর সম্পূর্ণ খাদ্যসংস্থান না করতে পারায় , তারা কখনাে বনভূমি থেকে পশুশিকার করে বা নদী থেকে মৎস্যশিকার করে বা বনভূমি থেকে ফলমূল সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে ।

সমস্যাঃ স্থানান্তর কৃষিকার্যের ফলে জমির মৃত্তিকার পুষ্টি উপাদানগুলি বিনষ্ট হয় , যেসমস্ত বাঁশের বা মাটির বাড়িতে কৃষকেরা থাকে সেগুলি দ্রুত নষ্ট হয় , বিভিন্ন পােকামাকড়ের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং বিভিন্ন মারণ রােগের সংক্রমণ ঘটে । জঙ্গলের মধ্যে চাষাবাদ চলায় বন্য জীবজন্তুরাও প্রায়শই আক্রমণ করে । এই সব কারণে কৃষকদের পক্ষে পরিব্রাজন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে । একটি জমির উর্বরতা নিঃশেষিত হলে তাকে সাধারণত তিন বছর ফেলে রাখা উচিত । কখনও কখনও এই সময় ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে । যদিও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে এখন স্থানান্তর কৃষিতেও কোনাে জমি বেশি সময় অনাবাদি অবস্থায় রাখা যাচ্ছে না , ফলস্বরূপ মৃত্তিকা – ক্ষয় ও বনভূমির ধ্বংসসাধন ক্রমাগত বেড়ে চলেছে । উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যায় পশ্চিম আফ্রিকার বৃষ্টি অরণ্যাঞ্চলের কথা , যেখানে জঙ্গল পােড়ানাের সময় সৃষ্ট দাবানলের প্রভাবে অরণ্যের স্থানে সাভানা জাতীয় শুষ্ক তৃণভূমির সৃষ্টি হয়েছে । যেহেতু স্থানান্তর কৃষিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিতে চাষাবাদ করা হয় , তাই সমগ্র জনগােষ্ঠীর জন্য খাদ্য উৎপাদন সর্বদা সম্ভবপর হয় না । এই কারণে চাষাবাদ ছাড়াও পশুশিকার , মৎস্য আহরণ , বনের ফল – মূল সংগ্রহ প্রভৃতিও অত্যন্ত গুরুত্ব পায় । কিছু কিছু গ্রামে হাঁস , মুরগি , ছাগল প্রভৃতি পালনও করা হয় । যদিও পশুপাখির বর্জ্য পদার্থগুলিকে সাররূপে কৃষিজমিতে ব্যবহার করার প্রচলন কৃষকদের মধ্যে নেই বললেই চলে ।

সমাধানঃ বর্তমান পৃথিবীতে স্থানান্তর কৃষিকার্য এক দ্বিমুখী সংকটের মধ্যে রয়েছে । একদিকে পরিবেশগত কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে এই কৃষিপদ্ধতি বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে । অন্যদিকে এই কৃষির সাথে জড়িত বিভিন্ন উপজাতি ও জনগােষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও আচার – আচরণের ঐতিহ্যও আধুনিক সভ্যতার চাপে লুপ্ত হতে বসেছে , যা ঐতিহাসিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এই কারণে বর্তমান পরিবেশবিদরা এই জনগােষ্ঠীগুলির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রেখেই তাদের স্থায়ী বসতি ও বিজ্ঞানসন্মত কৃষিপদ্ধতি গড়ে তােলার উপর জোর দিচ্ছেন । ভারতেও এই ধারণা অনুসারে মেঘালয় , মণিপুর প্রভৃতি রাজ্যের জনগোষ্ঠীগুলিকে শিক্ষিত করে তােলা হচ্ছে ।