নিবিড় জীবিকাসত্ত্বাভিত্তিক কৃষি

পরিচিতিঃ অধিক শ্রম ও মূলধন বিনিয়োগ করে পৃথিবীর যেসব দেশে জনসংখ্যার তুলনায় কৃষি জমির পরিমাণ তুলনামূলক কম সে সব দেশে সর্বাধিক ফসল উৎপাদনের জন্য যে কৃষি পদ্ধতি পরিচালিত হয়, তাকে নিবিড় জীবিকাসত্ত্বাভিত্তিক কৃষি বলা হয় । এর আর এক নাম প্রগাঢ় কৃষি । পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই কৃষি পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে বলে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ক্রিয়া-কলাপ হিসেবে বিবেচিত হয় ।

অবস্থানঃ নিবিড় জীবিকা সত্ত্বাভিত্তিক কৃষি প্রধানত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ও পার্শ্ববর্তী দ্বীপগুলিতে অর্থাৎ, মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্গত স্থানে দেখা যায় । ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, জাপান এবং দক্ষিণ চীনে এই কৃষি পদ্ধতি লক্ষণীয় ।

অনুকূল পরিবেশঃ
ক) প্রাকৃতিক পরিবেশঃ
১. উষ্ণতাঃ প্রগাঢ় কৃষি অঞ্চলে উষ্ণতার বৈষম্য লক্ষণীয় । যেমন- ক্রান্তীয় অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত কৃষির অন্তর্গত অঞ্চলে উষ্ণতা সবসময়ই বেশি, এমনকি শীতলতম মাসেও গড় উষ্ণতা প্রায় ২১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি থাকে । আবার উত্তরের প্রগাঢ় কৃষি অঞ্চলগুলিতেও উষ্ণতার পরিমাণ যথেষ্ট কম, এমনকি উষ্ণতম মাসেও গড় উষ্ণতা ১৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি থাকে । এই কৃষি পদ্ধতির প্রধান ফসল ধান, যা উষ্ণতাজনিত কারণে উত্তরাংশের তুলনায় দক্ষিণাংশের অঞ্চলগুলোতেই বেশি হয় ।
২. বৃষ্টিপাতঃ নিবিড় কৃষি ব্যবস্থায় বৃষ্টিপাতের তারতম্যের পরিমাণও যথেষ্ট লক্ষণীয় । বৃষ্টিপাতের পার্থক্য অনুসারে নিবিড় কৃষি অঞ্চলগুলিকে আর্দ্রতম অঞ্চল (২০০সেমি কম), অপেক্ষাকৃত শুষ্ক অঞ্চল (১২৫ সেমি -২০০ সেমি) ও শুষ্কতম অঞ্চল (১২৫ সেমির কম) ভাগে ভাগ করা হয় ।
৩. মৃত্তিকাঃ নিবিড় কৃষি অঞ্চলে বিভিন্ন মৃত্তিকায় ধান জন্মালেও সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত হল কাদা মাটির উপর প্রায় ১ মিটার পুরু পলিস্তরযুক্ত মৃত্তিকা ।এই মৃত্তিকার উর্বরতা ও জল ধারণ ক্ষমতা উভয়ই ধান চাষের পক্ষে খুবই উপযুক্ত ।
৪. ভূ-প্রকৃতিঃ মূলত নদী গঠিত সমভূমি ও নিম্নভূমি উপকূলীয় বা বদ্বীপ অঞ্চল ধান চাষের পক্ষে বিশেষ উপযোগী হলেও পাহাড়ের ঢালে ধাপ কেটেও চাষাবাদ করা যায় ।
খ) অর্থনৈতিক পরিবেশঃ
১. অত্যধিক জনসংখ্যাঃ পৃথিবীর এইসব অঞ্চলে জনসংখ্যার তুলনায় কৃষি জমির পরিমাণ কম বলে নিবিড় কৃষি পদ্ধতি পরিচালিত হয় ।
২. অধিক চাহিদাঃ এইপ্রকার কৃষি অঞ্চলগুলিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা অত্যন্ত বেশি বলে স্বাভাবিকভাবেই এই কৃষিব্যবস্থা পরিচালিত হয় ।
৩. ক্ষুদ্রায়তন কৃষিক্ষেত্রঃ এই কৃষিক্ষেত্রগুলির আয়তন খুবই ছোট আকারের । তাই এ সব স্থানে কৃষি পরিচালনার সুবিধার জন্য নিবিড় কৃষি পরিচালিত হয় ।
৪. মূলধনের যোগানঃ একটি জমি থেকে সর্বাধিক পরিমাণে ফসল উৎপাদনের জন্য নিবিড় কৃষিতে উচ্চ ফলনশীল বীজ, সার, কীটনাশক, জলসেচ, শ্রমের মজুরি প্রভৃতি কারণে প্রচুর মূলধন এর প্রয়োজন হয় ।
৫. অধিক শ্রমঃ নিবিড় কৃষি পদ্ধতিতে অপর একটি আবশ্যিক বিষয় হলো অধিক পরিমাণে কায়িক শ্রম, যা এই কৃষিতে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির থেকে বেশি প্রয়োজন হয় । এই কৃষিতে কৃষি শ্রমিকের কায়িক শ্রম অপরিহার্য ।

বৈশিষ্ট্যঃ নিবিড় কৃষির বৈশিষ্ট্যগুলি হল নিম্নরূপ-
১. জনসংখ্যার তুলনায় কৃষি জমির পরিমাণ কম ।
২. উচ্চ ফলনশীল বীজ ও সার প্রয়োগে কৃষির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ।
৩. অধিক শ্রম ও মূলধন বিনিয়োগ এই কৃষিতে আবশ্যিক ।
৪. বহু কৃষিব্যবস্থা এই কৃষি ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ।
৫. এই কৃষিতে হেক্টরপ্রতি ফসল উৎপাদন বেশি ।
৬. এই কৃষিতে মাথাপিছু উৎপাদন কম ।
৭. জলসেচ ব্যবস্থার প্রয়োজন এই কৃষিতে খুবই বেশি ।
৮. এই কৃষিব্যবস্থার কৃষি ক্ষেত্রগুলি ক্ষুদ্রায়তন ।
৯. এই কৃষি ক্ষুদ্র মালিকানায় পরিচালিত ।
১০. উৎপন্ন ফসলের উদ্বৃত্ত বলে কিছুই এই কৃষি ব্যবস্থায় থাকেনা ।
১১. এটি একটি জীবিকাসত্ত্বাভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা ।