পেট্রোরাসায়নিক শিল্প বা পেট্রোরসায়ন শিল্প বা পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প (Petrochemical Industry):

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  • ভূমিকাঃ পেট্রোরসায়ন শিল্পকে সূর্যোদয় শিল্প বা উদীয়মান শিল্প বলা হয় । ভারতে এই শিল্পের বয়স মাত্র ৫০ বছরের কিছু বেশী । তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষের দিকে ১৯৬৬ সাল থেকে দেশে এই শিল্পের সূত্রপাত ঘটে । ১৯৬৬ সালে ট্রম্বেতে Union Carbide Limited প্রথম পেট্রোরসায়ন কারখানা স্থাপন করে । ১৯৬৭-৬৮ সালে আরও দুটি কারখানা বেসরকারী মালিকানায় স্থাপিত হয় । ১৯৬৯ সালে ভারত সরকার গুজরাটের বদোদরায় এবং পরবর্তী কালে আসামের বংগাইগাঁওতে বৃহদাকার পেট্রোরসায়ন কারখানা স্থাপন করে । 
  • কাঁচামালঃ এই শিল্পের কাঁচামাল মূলত তিনপ্রকার । যথা – ক) কঠিন কাঁচামাল খ) তরল কাঁচামাল ও গ) গ্যাসীয় কাঁচামাল । প্রাকৃতিক গ্যাস প্রধানত মিথেন, ইথেন, প্রোপেন ও বুটেন সমৃদ্ধ । প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণত আসামের নাহারকাটিয়া ও মোরেন তৈলখনি অঞ্চলের এবং গুজরাটের আংকেলেশ্বর ও কাম্বে উপসাগরের নিকট পাওয়া যায় । এছাড়াও, বোম্বে হাই অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাস পর্যাপ্ত পরিমানে পাওয়া যায় । পেট্রোরসায়ন শিল্পগুলিকে নিম্নলিখিতভাবে শ্রেনীবিভাগ করা যায় –
শ্রেণী উৎপাদিত সামগ্রী
প্লাস্টিকপলিথিন, পিভিসি, পলিপ্রোপেলিন
সিন্থেটিক ফাইবারপলিয়েস্টার, নাইলন
সিন্থেটিক রাবারবুটেডিন, পলিবুটেডিন
সিন্থেটিক জৈব-রাসায়নিক দ্রব্যপ্লাস্টিক, সিন্থেটিক, ফাইবার, পেস্টিসাইডস, ফার্মাসিটিক্যালস
  • ব্যবহারঃ পেট্রোরাসায়নিক শিল্পের ব্যবহারগুলি হলো নিম্নরূপ –
    • ১. শিল্প ও কৃষির উন্নতি ও প্রসারণের জন্য এই শিল্পের প্রয়োজনীয়তা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য । 
    • ২. এই শিল্পোদ্ভুত রাসায়নিক দ্রব্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রত্যেক শিল্পে ব্যবহৃত হয় । 
    • ৩. স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাক্ষেত্রে ঔষধপত্র উৎপাদনের কাঁচামাল হিসাবে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহৃত হয় । 
    • ৪. দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত নানা দ্রব্য যেমন – জুতো, বালতি, চেয়ার প্রভৃতি এবং পরিধেয় দ্রব্য বর্তমানে এই শিল্পের অন্যতম উৎপাদন । সিন্থেটিক কাপড় সুতির কাপড়ের চেয়ে বেশী টেকসই বলে এর ব্যবহারও দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে । 
    • ৫. সিন্থেটিক রাবার পরিবহন শিল্পের অভাবনীয় উন্নতি ঘটিয়েছে । 
    • ৬. নির্মাণকার্যে প্লাস্টিকের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে । দরজা-জানালা তৈরীতেও কাঠের বদলে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে । 
    • ৭. মোড়ক হিসাবে আধুনিক যুগে প্রায় সবক্ষেত্রেই প্লাস্টিকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে । 
    • ৮. প্রসাধনী ও সুগন্ধি দ্রব্য উৎপাদনের জন্য রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয় ।
  • বন্টনঃ ভারতে পেট্রোরাসায়নিক শিল্পের বন্টন নিম্নরূপ –
    • ১. পশ্চিমাঞ্চলঃ ১৯৬৬ সালে Union Carbide Indian Limited এর মালিকানায় ট্রম্বেতে পলিপ্রোপেলিন, ইথাইল এসিটেট, স্পিরিট প্রভৃতি সামগ্রী উৎপাদনের জন্য এই কারখানাটি স্থাপিত হয় । এরপর ১৯৬৮ সালে মসোৎলাল শেট্টির উদ্যোগে থানেতে National Organic Chemicals Limited নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয় । উৎপাদিত সামগ্রীগুলি ছিল ইথিলিন, বেঞ্জিন, পলিইথিলিন, PVC, বুটাডিন প্রভৃতি । ১৯৬৯ সালে সরকারী পরিচালনায় বদোদরাতে Indian Petrochemical Corporation Limited নামে সংস্থাটি গঠিত হয় । প্রধানত জাইলিন, বুটাডিন, বেঞ্জিন প্রভৃতি সামগ্রী উৎপাদনের জন্য এই সংস্থাটি গঠিত হয় । গুজরাটের কয়ালিতে স্থাপিত পেট্রোরাসায়নিক কারখানাটি বেসরকারী মালিকানাধীন । ন্যাপথা উপজাত সামগ্রী উৎপাদনের জন্য এই কারখানাটি স্থাপিত হয় । 
    • ২. দক্ষিনাঞ্চলঃ ব্রিটেনের Distillars Company Limited এবং USA এর Hercules Power Company এর সহযোগিতায় মাদ্রাজে Madras Petrochemical নামে একটি সংস্থাটি গঠিত হয় । এই সংস্থাটি Herdilia Chemicals নামে পরিচিত । এখানে ফেনল, এসিটোল প্রভৃতি দ্রব্য উৎপাদিত হয় ।
    • ৩. পূর্বাঞ্চলঃ সরকারী নিয়ন্ত্রণাধীন বংগাইগাঁও পেট্রোকেমিক্যালস ন্যাপথা উপজাত সামগ্রী এবং বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম তন্তু উৎপাদন করে । হলদিয়া তৈল শোধনাগারের উৎপাদিত সামগ্রীর উপর নির্ভর করে ন্যাপথার উপজাত সামগ্রী, রান্নার গ্যাসসহ বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য প্রস্তুত করার জন্য কারখানা স্থাপন করা হয়েছে ।
  • ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাঃ ভারতে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার চিত্রটি সংক্ষেপে নিম্নরূপ –
    • ১. ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পের প্রসার ঘটার কারণে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে । 
    • ২. মোটরগাড়ী নির্মাণ শিল্পের ক্রমবর্ধমান উন্নতির সাথে সাথে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পেরও প্রসার ঘটবে । 
    • ৩. সার ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের মধ্যে ন্যাপথার দামের তারতম্য কমানো সম্ভব হলে এই শিল্পের উন্নতি আরও বৃদ্ধি পাবে । 
    • ৪. কাস্টমস ডিউটি, সেল ট্যাক্স প্রভৃতি কর ও শুল্কের বোঝা কমাতে পারলে এই শিল্পের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে । 
    • ৫. কাঁচামালের অপ্রতুলতা এই শিল্পের উন্নতির জন্য প্রধান অন্তরায় । বিদেশ থেকে উপযুক্ত পরিমানে কাঁচামাল আমদানি করতে পারলে এবং দেশের মধ্যে নতুন নতুন কাঁচামালের উৎসের সন্ধান পেলে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ভীষণভাবে উজ্জ্বল ।
পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প

Related Posts

4 thoughts on “পেট্রোরাসায়নিক শিল্প বা পেট্রোরসায়ন শিল্প বা পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প (Petrochemical Industry):

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *