আয়ন বায়ু (Trade Winds):

☻ বুৎপত্তিগত অর্থঃ স্যাকসন শব্দ ‘Treadon’ থেকে ‘Trade’ শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ কিন্তু ‘বানিজ্য’ নয় । এর অর্থ হল ‘নিয়মিত গতিপথে’ । আয়ন বায়ুর গতিবেগ ও গতিপথ উভয়ই নিয়মিত হওয়ায় প্রাচীনকালে পালতোলা জাহাজের সাহাজ্যে এই আয়ন বায়ুকে কাজে লাগিয়ে উভয় গোলার্ধের ক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশগুলিতে সমুদ্রপথে ব্যবসা-বানিজ্য চলত । সেইজন্য এই বায়ু ব্যবসা-বানিজ্যের সহায়ক বলে শব্দার্থের পরিবর্তন করে বানিজ্য বায়ু (Trade Winds) নামকরণ করা হয়েছে ।

সংজ্ঞাঃ কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয়মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে সারাবছর একই গতিবেগে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে আয়ন বায়ু (Trade Winds) বলা হয় ।

আয়ন বায়ু (Trade Winds)

আয়ন বায়ু (Trade Winds)

অবস্থানঃ উভয় গোলার্ধের ৫°-২৫° উ:/দ: অক্ষাংশের মধ্যে আয়ন বায়ুর উপস্থিতি অনুভব করা যায় ।
শ্রেণীবিভাগঃ গতিপথ অনুযায়ী আয়ন বায়ু দুই প্রকার । যথা –
১. উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু (North East Trade Winds): নিরক্ষীয় নিম্নচাপ অঞ্চলে উষ্ণ ও হালকা বায়ু উপরে উঠে গেলে চাপের সমতা রক্ষার জন্য উত্তর গোলার্ধের কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে একটি বায়ুপ্রবাহ সারাছর নিয়মিতভাবে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় অঞ্চলের নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয় । উত্তর গোলার্ধের এই নিয়মিত আয়ন বায়ুপ্রবাহটি উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু (North East Trade Winds) নামে পরিচিত ।
বিস্তারঃ নিরক্ষরেখা থেকে প্রায় ২৫° উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয় ।
বৈশিষ্ট্যঃ উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু – র বৈশিষ্ট্যগুলি হল নিম্নরূপ –
ক) এইপ্রকার বায়ুপ্রবাহ ঘন্টায় প্রায় ১৬ কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত হয় ।
খ) এইপ্রকার বায়ু উচ্চ অক্ষাংশ থেকে নিম্ন অক্ষাংশে প্রবাহিত হয় বলে এর জলীয় বাষ্প ধারণ করার শক্তি বেড়ে যায় ।
গ) এইপ্রকার বায়ুপ্রবাহ নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে আসার সময় ফেরেলের সূত্রানুসারে ডানদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয় ।
২. দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু (South East Trade Winds): নিরক্ষীয় নিম্নচাপ অঞ্চলে উষ্ণ ও হালকা বায়ু উপরে উঠে গেলে চাপের সমতা রক্ষার জন্য দক্ষিণ গোলার্ধের মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে একটি বায়ুপ্রবাহ সারাছর নিয়মিতভাবে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ অঞ্চলের নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয় । দক্ষিণ গোলার্ধের এই নিয়মিত আয়ন বায়ুপ্রবাহটি দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু (South East Trade Winds) নামে পরিচিত ।
বিস্তারঃ নিরক্ষরেখা থেকে প্রায় ৩৫° দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয় ।
বৈশিষ্ট্যঃ দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু – র বৈশিষ্ট্যগুলি হল নিম্নরূপ –
ক) এইপ্রকার বায়ুপ্রবাহ ঘন্টায় প্রায় ২২ কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত হয় ।
খ) এইপ্রকার বায়ুপ্রবাহ নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে আসার সময় ফেরেলের সূত্র অনুসারে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয় ।

প্রভাবঃ আয়ন বায়ুর প্রভাবগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হওয়ার সময় প্রচুর জলীয় বাষ্প ধারণ করে, যার ফলে মহাদেশগুলির পুর্বদিকে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটে । ফলে সেখানে প্রচুর কৃষিজ ফসল জন্মায় । উদা- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব আফ্রিকা, ফ্লোরিডা, দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিলের বিভিন্ন স্থান কৃষিকার্যে বিশেষ উন্নতিলাভ করেছে ।
খ) পরবর্তীতে এই উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু যখন মহাদেশের পশ্চিমদিকে অগ্রসর হয়, তখন ঐ বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ক্রমশ কমতে থাকে । ফলে মহাদেশের পশ্চিমভাগে বৃষ্টিপাতের অভাবে মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছে । যেমন – কালাহারি মরুভূমি, সাহারা মরুভূমি, আটাকামা মরুভূমি, সোনেরান মরুভূমি প্রভৃতি । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এইসকল মরুভূমি অঞ্চলগুলিতে বছরের পর বছর বৃষ্টিপাতের অভাবে ক্রমশ মরুভূমির প্রসার ঘটছে ।
গ) উত্তর গোলার্ধে আয়ন বায়ু প্রবাহিত অঞ্চল থেকে দক্ষিণ গোলার্ধে আয়ন বায়ু প্রবাহিত অঞ্চল অনেকটা আরামদায়ক থাকে ।

8 thoughts on “আয়ন বায়ু (Trade Winds):

  1. Pingback: বায়ুপ্রবাহ (Winds): | bhoogolok.wordpress.com

  2. Pingback: মহাদেশের পশ্চিমাংশে অধিকাংশ মরুভূমি সৃষ্টি হয়েছে কেন ? – bhoogolok.com

  3. Pingback: ফেরেলের সূত্র (Ferral’s Law): – bhoogolok.com

  4. Pingback: মৌসুমী বায়ু (Monsoon Wind): – bhoogolok.com

  5. Pingback: বায়ুপ্রবাহ (Winds): – bhoogolok.com

  6. Pingback: বায়ুচাপ বলয় (Pressure Belts of Wind): – bhoogolok.com

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.