নদীর পুনর্যৌবনলাভ (Rejuvenation) ও নিক পয়েন্ট (Knick Point):

☻নদীর পুনর্যৌবনলাভ (Rejuvenation):
সংজ্ঞাঃ একটি ক্ষয়চক্র সম্পুর্ণ হতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা শেষ পর্যায়ে পৌছাবার আগেই সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের উন্নয়ন ঘটলে বা সমুদ্রজলতলের পরিবর্তন ঘটলে নদীঢালের সামঞ্জস্য নষ্ট হয় । এর ফলে নদী তার ঢালের সামঞ্জস্য পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য নতুনভাবে তার ক্ষয়কার্য দ্রুত গতিতে শুরু করে অর্থাৎ নদী তার বার্ধক্য অবস্থা থেকে পুনরায় যৌবন অবস্থাপ্রাপ্ত হয় । একে নদীর পুনর্যৌবনলাভ (Rejuvenation) বলে ।

উদাঃ ভূমধ্যসাগরের জলতল নেমে যাওয়ার কারণে নীল নদের পুনর্যৌবনলাভ এবিষয়ে একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ ।

বৈশিষ্ট্যঃ নদীর পুনর্যৌবনলাভ – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) পুনর্যৌবনলাভের ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ভূমিরূপগুলিকে নদী পুনরায় তার কার্য দ্বারা প্রভাবিত করতে থাকে ।
খ) এর ফলে একটি নতুন ক্ষয়চক্রের সূচনা হয় ।
গ) উপত্যকা গঠনের কাজ আবার নতুনভাবে শুরু হয় ।
ঘ) নদী তার নদীবক্ষকে গভীরভাবে কর্তন করে ও পুরানো নদী উপত্যকা নদীর দুপাশে ধাপ সৃষ্টি করে নদীমঞ্চরূপে অবস্থান করে ।

সৃষ্টির কারণ বা নিয়ন্ত্রকসমূহঃ নদীর পুনর্যৌবনলাভ সৃষ্টির কারণ বা নিয়ন্ত্রকগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) ভূ-আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের উত্থান বা সমুদ্র-গহ্বরের অবনমন,
খ) সমুদ্রের অপসারণ,
গ) জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীতে জলের পরিমান বৃদ্ধি,
ঘ) একটি নদীগোষ্ঠীর অপর নদীগোষ্ঠীতে আত্মসমর্পন ও নদীগোষ্ঠীর পূনর্বিন্যাস,
ঙ) নদীর বোঝা হ্রাস প্রভৃতি ।

সৃষ্ট ভূমিরূপঃ নদীর পুনর্যৌবনলাভের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলি হলো –
ক) পূনর্গঠিত উপত্যকা,
খ) নিক পয়েন্ট,
গ) নদীমঞ্চ বা নদীসোপান,
ঘ) কর্তিত নদীবাঁক,
ঙ) স্বাভাবিক সেতু,
চ) জলপ্রপাত প্রভৃতি ।

শ্রেণীবিভাগঃ নদীর পুনর্যৌবনলাভ মূলত তিনপ্রকার । যথা –
ক) গতিজনিত পুনর্যৌবনলাভ (Dynamic Rejuvenation): ভূ-আন্দোলনের ফলে নদী অববাহিকাসংশ্লিষ্ট ভূ-ভাগ কাত হয়ে বা হেলে পড়লে অথবা অথবা চ্যুতি দ্বারা প্রভাবিত হলে নদীর ঢাল অনেকসময় অত্যাধিক বৃদ্ধি পায় । ফলস্বরূপ নদী পুনর্যৌবনলাভ করে এবং তার নিম্নক্ষয় ক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় । একে নদীর গতিজনিত পুনর্যৌবনলাভ (Dynamic Rejuvenation) বলে ।
খ) স্থিতিজনিত পুনর্যৌবনলাভ (Static Rejuvenation): ভূ-আন্দোলনজনিত কোনপ্রকার উত্থান-পতন ছাড়াই নদীর বোঝা হ্রাস, নদীতে জলপ্রবাহের পরিমান বৃদ্ধি, নদীগোষ্ঠীর পুনর্বিন্যাস প্রভৃতি কারণে স্থিতিশীল ভূ-পৃষ্ঠস্থ নদীর পুনর্যৌবনলাভ হলে তাকে স্থিতিজনিত পুনর্যৌবনলাভ (Static Rejuvenation) বলে ।
গ) সমুদ্রতলজনিত পুনর্যৌবনলাভ (Eustatic Rejuvenation): সমুদ্র-গহ্বরের ধারণ ক্ষমতার হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে অথবা মহাদেশীয় হিমবাহের দ্বারা সমুদ্রজলতলের হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন ঘটে । এমতাবস্থায়, নদী পুনরায় তার প্রবাহে যৌবনাবস্থা লাভ কলে তাকে সমুদ্রতলজনিত পুনর্যৌবনলাভ (Eustatic Rejuvenation) বলে ।


☻নিক পয়েন্ট (Knick Point):
সংজ্ঞাঃ ক্ষয়চক্র অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শেষ পর্যায়ে পৌছাবার আগেই সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের উন্নয়ন ঘটলে বা সমুদ্রজলতলের পরিবর্তন ঘটলে নদীঢালের সামঞ্জস্য নষ্ট হয় । এর ফলে নদী তার ঢালের সামঞ্জস্য পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য নতুনভাবে তার ক্ষয়কার্য দ্রুত গতিতে শুরু করে । এই নতুন ঢাল ও পুরানো ঢাল মিলনস্থলে একটি খাঁজ সৃষ্টি হয় । এই খাঁজকেই নিক পয়েন্ট (Knick Point) বলে ।

নিক পয়েন্ট (Knick Point)

নিক পয়েন্ট (Knick Point)

উদাঃ কাঞ্চি নদীতে নিক পয়েন্ট দেখা যায় ।

বৈশিষ্ট্যঃ নিক পয়েন্ট (Knick Point) – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) নিক পয়েন্ট ঢালের পার্থক্যকে নির্দেশ করে ।
খ) সাধারণতঃ নিক পয়েন্টে জলপ্রপাত সৃষ্টি হয় । [নদীর প্রবাহপথে তার ঢালের সামঞ্জস্য বিঘ্নিত হলে নদী তা ফিরিয়ে আনবার জন্য পুনরায় মস্তকের দিকে নতুন খাঁত কেটে অগ্রসর হয় এবং ঐ নতুন ঢাল ও পুরানো ঢাল যেখানে মিলিত হয় সেই স্থানে ঢালজনিত পার্থক্যের জন্য নদীর জলধারা উপর থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে জলপ্রপাত সৃষ্টি করে । এই কারণে অধিকাংশ নিক পয়েন্টেই জলপ্রপাত সৃষ্টি হতে দেখা যায় ।]
গ) নদী অববাহিকার উত্থান বা সমুদ্র-গহ্বরের অবনমন, সমুদ্রের অপসারণ, নদীতে জলের পরিমান বৃদ্ধি, নদীগোষ্ঠীর পুনর্বিন্যাস প্রভৃতি কারণে নদীতে ঢালের পার্থক্য সৃষ্টি হলে নিক পয়েন্ট সৃষ্টি হয় ।
ঘ) সময়ের সাথে সাথে এটি ক্রমশ মস্তকের দিকে সরে যেতে থাকে এবং অবশেষে অবলুপ্ত হয়ে পর্যায়িত ঢালে পরিনত হয় ।

2 thoughts on “নদীর পুনর্যৌবনলাভ (Rejuvenation) ও নিক পয়েন্ট (Knick Point):

  1. Pingback: নদীমঞ্চ বা নদীসোপান (River Terrace): – bhoogolok.com

  2. Pingback: ‘V’ – আকৃতির নদী উপত্যকা (‘V’ – shaped River Valleys) এবং গিরিখাত (Gorges): | bhoogolok.com

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.