ব-দ্বীপ (Delta):

☻নামকরণঃ গ্রীক অক্ষর ‘Δ’ (Delta) বা বাংলা অক্ষর মাত্রাহীন ‘ব’ এর থেকে ব-দ্বীপ বা Delta শব্দটি এসেছে ।

সংজ্ঞাঃ মোহনায় এসে নদীগর্ভে বালি, পলি, কর্দম প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে নদীবক্ষে প্রায় ত্রিকোণাকার ভূমিভাগ গড়ে উঠলে তাকে ব-দ্বীপ (Delta) বলে ।

ব-দ্বীপ (Delta)

ব-দ্বীপ (Delta)

উদাঃ গঙ্গা নদী ও ব্রক্ষ্মপুত্র নদের মোহনায় গঠিত মিলিত ব-দ্বীপ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ । পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বেশীরভাগ অঞ্চল নিয়ে গড়ে ওঠা সুবিশাল এই ব-দ্বীপের আয়তন প্রায় ৭৭,০০০ বর্গ কিলোমিটার ।

উৎপত্তিঃ নদীর মোহনায় সুক্ষ্ম পলির সঞ্চয় বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে নদীগর্ভ অধিক পলি সঞ্চয় দ্বারা ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে ওঠে । ফলে নদীর গভীরতা কমে যায় । এদিকে ভূমিঢালও একেবারে কমে যাওয়ার ফলে নদীতে স্রোত বিশেষ থাকে না বললেই চলে । এমতাবস্থায় নদীপ্রবাহে সামান্য বাঁধা পেলেই নদী বহু শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে প্রবাহিত হয় । নদীর দুই শাখার মধ্যবর্তী অংশে বালি, পলি, কর্দম প্রভৃতির সঞ্চয় ঘটে । সময়ের সাথে সাথে এই সঞ্চয় ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ত্রিকোণাকৃতি ব-দ্বীপ গড়ে ওঠে ।

আদর্শ ব-দ্বীপ গড়ে ওঠার অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশঃ একটি আদর্শ ব-দ্বীপ গড়ে ওঠার অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ বা শর্তগুলি হলো নিম্নরূপ –
a) সংশ্লিষ্ট সমুদ্র অপেক্ষাকৃত শান্ত ও তাতে জোয়ারভাটার প্রকোপ কম থাকা প্রয়োজন ।
b) মোহনাসংশ্লিষ্ট সমুদ্র স্থলভাগ দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়া প্রয়োজন ।
c) নদীস্রোতের বিপরীতমুখী জোরালো বায়ুপ্রবাহ থাকা প্রয়োজন ।
d) নদীটি দীর্ঘ গতিপথবিশিষ্ট এবং তার তিনপ্রকার প্রবাহই (উচ্চপ্রবাহ, মধ্যপ্রবাহনিম্নপ্রবাহ) সুস্পষ্টভাবে থাকা আবশ্যক ।
e) নদীবাহিত পললরাশির পরিমান অধিক হওয়া প্রয়োজন ।
f) মোহনার কাছে সমুদ্র অগভীর হওয়া আবশ্যক ।
g) সমুদ্রের জলে লবনতা বেশী হলে তা ব-দ্বীপ গঠনের পক্ষে সহায়ক হয় ।
h) মোহনার কাছে সমুদ্রজলের ঘনত্ব বেশী হলে তা ব-দ্বীপ গঠনের পক্ষে আদর্শ হয় ।

শ্রেণীবিভাগঃ মূলত তিন প্রকার দৃষ্টিকোণ থেকে ব-দ্বীপকে বিভক্ত করা হয় । যথা –
ক) উৎপত্তি অনুযায়ী – ব-দ্বীপ কিভাবে সৃষ্টি হচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে ব-দ্বীপকে মুলত দুই ভাগে বিভক্ত করা যায় । যথা –
১. গঠনমূলক ব-দ্বীপঃ আমরা জানি পৃথিবীর অধিকাংশ ব-দ্বীপ নদীর সঞ্চয়কার্যের ফলে গঠিত হয় । তবুও দেখা যায়, এই জাতীয় ব-দ্বীপ গঠনে সমুদ্রের তরঙ্গ বা জোয়ার-ভাটার প্রভাব বিশেষ কার্যকরী হয় না । কেবলমাত্র নদীর সাথে বয়ে আনা অধিক পলির পরিমানের উপর নির্ভর করেই গঠনমূলক ব-দ্বীপ গড়ে ওঠে । এই শ্রেণীর ব-দ্বীপ মূলত গ্রীক অক্ষর ‘Δ’ (Delta) বা বাংলা অক্ষর মাত্রাহীন ‘ব’ এর মত দেখতে ।
উদাঃ গঙ্গা, হোয়াংহো, পো, রোন, নীল প্রভৃতি নদ-নদীর মোহনায় গঠিত ব-দ্বীপ এই শ্রেণীর অন্তর্গত ।
২. ক্ষয়ধর্মী ব -দ্বীপঃ জোয়ার-ভাটা এবং সমুদ্রতরঙ্গের আঘাতে ক্ষয়কার্যের ফলে যে ব-দ্বীপ গঠিত হয়, তাকে ক্ষয়ধর্মী ব-দ্বীপ বলে ।
উদাঃ মিসিসিপি নদীর ব-দ্বীপ এই শ্রেণীর অন্তর্গত ।

খ) অবস্থান অনুযায়ী – ব-দ্বীপের অবস্থান অনুযায়ী একে তিন ভাগে ভাগ করা যায় । যথা –
১. নদী ব-দ্বীপঃ প্রধান নদীর সাথে যেখানে উপনদী এসে মিলিত হয় সেখানে উপনদী দ্বারা নুড়ি, বালি, কর্দম প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে ত্রিকোণাকার ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয় । একে নদী ব-দ্বীপ বলে ।
উদাঃ দামোদর ও হুগলী নদীর মিলনস্থলে এরকম ব-দ্বীপ দেখা যায় ।
বৈশিষ্ট্যঃ নদী ব-দ্বীপ – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
a) এইপ্রকার ব-দ্বীপ নদী ও উপনদীর মিলনস্থলে গড়ে ওঠে ।
b) উপনদীবাহিত পদার্থের পরিমান ও প্রকৃতির উপর নদী ব-দ্বীপের আকৃতি নির্ভর করে ।
২. হ্রদ ব-দ্বীপঃ বিশাল হ্রদে অনেকসময় নদী এসে পতিত হয় । এর ফলে নদীবাহিত নুড়ি, বালি, কর্দম প্রভৃতি হ্রদসংলগ্ন নদীমোহনায় জমা হয়ে ব-দ্বীপ গড়ে উঠলে তাকে হ্রদ ব-দ্বীপ বলে ।
উদাঃ ইউরোপে কাষ্পিয়ান সাগরে পতিত ভলগা নদীর মোহনায় এরূপ একটি সুবিশাল হ্রদ ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছে ।
বৈশিষ্ট্যঃ হ্রদ ব-দ্বীপ – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
a) হ্রদের আকার বিশাল হলে এবং নদীবাহিত পদার্থের পরিমান বেশী হলে এরূপ ব-দ্বীপ বিশালাকৃতি হতে পারে ।
b) হ্রদের জলরাশি অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকার ফলে ব-দ্বীপের সম্মুখভাগ হ্রদতরঙ্গ দ্বারা বিশেষ প্রভাবিত হয় না ।
এবং
৩. সমুদ্র ব-দ্বীপঃ নদী যেখানে সমুদ্রে মিলিত হয়, সেই অংশকে নদীর মোহনা বলে । এই অংশে নদীর স্রোত সমুদ্রে বাঁধাপ্রাপ্ত হয় বলে নদীবাহিত যাবতীয় পলি, বালি, কর্দম এই স্থানে জমা হয় এবং ব-দ্বীপ গড়ে ওঠে । একে সমুদ্র ব-দ্বীপ বলে ।
উদাঃ গঙ্গানদী ও ব্রক্ষ্মপুত্র নদের মোহনায় গঠিত মিলিত ব-দ্বীপ এই প্রকার ব-দ্বীপের উদাহরণ, যেটি আবার পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপও (আয়তন প্রায় ৭৭,০০০ বর্গ কিলোমিটার) বটে ।
বৈশিষ্ট্যঃ সমুদ্র ব-দ্বীপ – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
a) নদীর স্রোত সমুদ্রে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে এরূপ ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয় ।
b) এইপ্রকার ব-দ্বীপ মূলত স্থলভাগ দ্বারা বেষ্টিত ও অপেক্ষাকৃত শান্ত সমুদ্রসংলগ্ন মোহনায় গড়ে ওঠে ।

গ) আকৃতি অনুযায়ী – আকৃতি অনুযায়ী ব-দ্বীপকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় । যথা –

১. ত্রিকোণাকৃতি ব-দ্বীপঃ প্রধান নদীতে উপনদী এসে মিশলে বা প্রধান নদী থেকে শাখানদী বেরিয়ে গেলে সেই বিশেষ সংযোগস্থলে পলি, বালি, কাদা প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে যে আয়তন প্রায় ৭৭,০০০ বর্গ কিলোমিটার সৃষ্টি হয় তা প্রধানত প্রায় তিন কোণা দেখতে হয় বলে একে ত্রিকোণাকৃতি ব-দ্বীপ বলে ।

ত্রিকোণাকৃতি ব-দ্বীপ

ত্রিকোণাকৃতি ব-দ্বীপ

উদাঃ দামোদর নদ ও হুগলী নদীর সংযোগস্থলে সৃষ্টি হওয়া ব-দ্বীপ ।
বৈশিষ্ট্যঃ ত্রিকোণাকৃতি ব-দ্বীপ – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ a) এই শ্রেণীর ব-দ্বীপ মূলত গ্রীক অক্ষর ‘Δ’ (Delta) বা বাংলা অক্ষর মাত্রাহীন ‘ব’ এর মত দেখতে হয় ।
b) নদীবাহিত পদার্থের পরিমান ও প্রকৃতির উপর এইপ্রকার ব-দ্বীপের আকৃতি নির্ভর করে ।
২. ধনুকাকৃতি ব-দ্বীপ (Arcuate Delta): যে সকল ব-দ্বীপের সমুদ্রমুখী রেখা সমুদ্রের দিকে ধনুকের মত বেঁকে যায়, তাদের ধনুকাকৃতি ব-দ্বীপ (Arcuate Delta) বলে ।
উদাঃ নীলনদের ব-দ্বীপ, হোয়াংহো নদীর ব-দ্বীপ, রাইন নদীর ব-দ্বীপ প্রভৃতি ।

ধনুকাকৃতি ব-দ্বীপ (Arcuate Delta)

ধনুকাকৃতি ব-দ্বীপ (Arcuate Delta)

ধনুকাকৃতি ব-দ্বীপ (Arcuate Delta)

ধনুকাকৃতি ব-দ্বীপ (Arcuate Delta)

বৈশিষ্ট্যঃ ধনুকাকৃতি ব-দ্বীপ – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
a) এই প্রকার ব-দ্বীপ ভারী পদার্থ যেমন – কাদার স্তর, নুড়ি, বালি প্রভৃতি দ্বারা গঠিত হয় ।
b) এই প্রকার ব-দ্বীপ প্রতি বছরই একটু একটু করে সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হয় বলে এদের বর্ধনশীল ব-দ্বীপও বলা হয় ।

৩. পক্ষীপদসদৃশ ব-দ্বীপ বা পাখির পায়ের মত ব-দ্বীপ (Bird-foot Delta): ব-দ্বীপের আকৃতি বিবর্তিত হতে হতে কালক্রমে তা পাখির পায়ের মত আকার ধারণ করলে তাকে পক্ষীপদসদৃশ ব-দ্বীপ বা পাখির পায়ের মত ব-দ্বীপ (Bird-foot Delta) বলে ।

পক্ষীপদসদৃশ ব-দ্বীপ বা পাখির পায়ের মত ব-দ্বীপ (Bird-foot Delta)

পক্ষীপদসদৃশ ব-দ্বীপ বা পাখির পায়ের মত ব-দ্বীপ (Bird-foot Delta)

উদাঃ মিসিসিপি নদীর ব-দ্বীপ ।
উৎপত্তিঃ নদীবাহিত উপাদানগুলি যদি অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম ও হালকা প্রকৃতির হয় তাহলে প্রধান নদী ও তার শাখানদীগুলি সমুদ্রের অনেক ভিতরে এই সকল উপাদান গুলি বয়ে নিয়ে গিয়ে বিভিন্নদিকে সঞ্চয় করে । প্রধান নদী ও তার শাখানদীগুলি সমুদ্রের ভিতরে বহুধাবিভক্ত হয়ে এরূপ সঞ্চয় করতে থাকলে কালক্রমে পক্ষীপদসদৃশ ব-দ্বীপ বা পাখির পায়ের মত আকৃতির ব-দ্বীপ গড়ে ওঠে ।
বৈশিষ্ট্যঃ পক্ষীপদসদৃশ ব-দ্বীপ বা পাখির পায়ের মত ব-দ্বীপ – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
a) মোহনা অঞ্চলে অগভীর সমুদ্র ও নদীর স্রোত অপেক্ষাকৃত বেশী হওয়া (যাতে সমুদ্রের বেশ কিছুটা অভ্যন্তরে নদীপ্রবাহ প্রবেশ করতে পারে) এই প্রকার ব-দ্বীপ সৃষ্টি হওয়ার জন্য খুবই আবশ্যক ।
b) অধিকাংশক্ষেত্রেই সূক্ষ্ম ও হালকা বালি, পলি, কাদামাটি, চুনাপাথর প্রভৃতি এই প্রকার ব-দ্বীপ গঠনের প্রধান উপাদান হিসাবে দেখা যায় ।
৪. তীক্ষাগ্র ব-দ্বীপ বা কাসপেট ব-দ্বীপ (Cuspate Delta)ত্রিকোণাকার ব-দ্বীপের মধ্যভাগ বরাবর প্রবাহিত মূল নদীটি যদি ক্রমশ সমুদ্রের অভ্যন্তরভাগে আরও প্রবেশ করতে থাকে তাহলে ঐ মূল নদীর দুই পাশে বাহিত পদার্থ সঞ্চিত হয়ে ত্রিকোণাকার ব-দ্বীপের অগ্রভাগ করাতের দাঁতের মত তীক্ষ্ণতা লাভ করে যে বিশেষ আকৃতির ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয় তাকে তীক্ষাগ্র ব-দ্বীপ বা কাসপেট ব-দ্বীপ (Cuspate Delta) বলে ।
উদাঃ স্পেনের এব্রো ও ইটালির তাইবার নদীতে এইপ্রকার ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছে ।
বৈশিষ্ট্যঃ তীক্ষাগ্র ব-দ্বীপ বা কাসপেট ব-দ্বীপ – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
a) কাসপেট স্পিট থেকেই কালক্রমে এইপ্রকার ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয় ।
b) মোহনা অঞ্চলে অগভীর সমুদ্র ও নদীর স্রোত অপেক্ষাকৃত বেশী হওয়া (যাতে সমুদ্রের বেশ কিছুটা অভ্যন্তরে নদীপ্রবাহ প্রবেশ করতে পারে) এই প্রকার ব-দ্বীপ সৃষ্টি হওয়ার জন্য খুবই আবশ্যক ।
c) সমুদ্রতরঙ্গ ও জোয়ারভাটার ক্ষয়কার্যের প্রভাবে এইপ্রকার ব-দ্বীপের সম্মুখভাগ করাতের ধাঁরালো দাঁতের মত আকৃতি ধারণ করে ।

11 comments

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s