নদীর বহনকার্য কি? এর প্রক্রিয়াগুলি কি কি?

সংজ্ঞাঃ নদী তার ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট পদার্থগুলিকে (শিলাখন্ড, বালুকা, কর্দম প্রভৃতি) বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তার জলস্রোতের সাথে বয়ে নিয়ে অগ্রসর হয়, একে নদীর বহনকার্য (Transportation of River) বলে ।

নিয়ন্ত্রকঃ নদীর বহনকার্য – এর নিয়ন্ত্রকগুলি হলো মূলত তার জলের পরিমান, গতিশক্তি, ভূমির ঢাল, বাহিত বোঝার পরিমান, শিলার প্রকৃতি, নদী উপত্যকার প্রকৃতি প্রভৃতি । তবে এদের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো নদীর জলের পরিমান ও নদীর গতিবেগ । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নদীর গতিবেগ (Velocity) প্রত্যক্ষভাবে নির্ভর করে ঢালের (Slope) উপর । নদীর ঢাল বৃদ্ধি পেলে নদীর গতিবেগও বৃদ্ধি পায় । যদি একটি নদীর গতিবেগ দ্বিগুণ হয়ে যায় তাহলে তার বহন করার ক্ষমতাও সেই অনুপাতে ৬৪ গুণ বৃদ্ধি পাবে । অর্থাৎ, নদীর বহন করার ক্ষমতা তার গতিবেগের (Velocity) ষষ্ঠঘাত (Sixth Power) বৃদ্ধি পায় । একে নদীর ষষ্ঠঘাতের সূত্র (Sixth Power Law) বলে
আবার, নদীর জল কমে গেলে অথবা অধিক পরিমানে শিলাখন্ড নদীতে এসে পড়লে তার বহন করার শক্তিও সেই অনুপাতে কমতে থাকে । নীচে নদীর বহনকার্য – এর নিয়ন্ত্রকগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো –
১. নদীর জলের বেগঃ নদীর জলপ্রবাহের গতিবেগ সর্বদা নদীর শক্তির সাথে সমানুপাতিক; অর্থাৎ, নদীতে জলের বেগ বাড়লে নদীর ক্ষয় ক্ষমতা ও বহন ক্ষমতা যেমন বেড়ে যায়, ঠিক তেমনই বেগ কমলে উভয়ই কমে যায় ।
২. নদীতে জলের পরিমানঃ নদীতে জলের পরিমান বাড়ার সাথে সাথে যেমন নদীর ক্ষয় ও বহন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তেমনই জলের পরিমান কমে গেলে উভয়ই হ্রাস পায় । বন্যার সময় নদীতে জলের পরিমাণ বাড়লে নদীর জলের গতিবেগও বেড়ে যায় এবং তার বহন করবার ক্ষমতাও বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায় । ১৯৪৩ এবং ১৯৭৮ খ্ৰীষ্টাব্দে দামােদরের প্রবল বন্যায় নদীর গতিবেগ প্রবলভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় রাস্তা – ঘাট ও রেলপথ ভেঙে গিয়ে প্রচুর ধন – সম্পত্তির ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটে । আবার, নদীর জল কমে গেলে অথবা অধিক পরিমাণে প্রস্তরখণ্ড নদীতে আসলে তার বহন করবার শক্তিও সেই অনুপাতে কমতে থাকে । নদীর বহন করবার শক্তি যে কেবল তাহার জলের পরিমাণ ও গতির উপর নির্ভর করে , তা নয় । এটি প্রস্তরখণ্ডের আকৃতির উপরও নির্ভর করে । বৃহদাকার প্রস্তরখণ্ড একটি নদী যে পরিমাণে বহন করবে , সেই নদীটি ক্ষুদ্রাকার প্রস্তরখণ্ড তা অপেক্ষা অধিক পরিমাণে বহন করতে পারবে ।
৩. ভূমির ঢালঃ ভূমির ঢালের উপর নির্ভর করে নদীস্রোতের গতিবেগ অর্থাৎ, ভূমির ঢাল বেড়ে গেলে নদীর ক্ষয় ও বহনশক্তি যেমন বেড়ে যায়, তেমনই ভূমির ঢাল কম হলে নদীর গতিবেগও ধীর হয়ে যায় । ফলত নদীর শক্তি (ক্ষয় ও বহন) হ্রাস পায় ।
৪. শিলার প্রকৃতিঃ নদীবক্ষ গঠনকারী শিলার প্রকৃতির উপরও নদীর বহনকার্য অনেকাংশে নির্ভর করে ।
৫. নদীবাহিত বোঝার পরিমাণ ও আকৃতিঃ নদীর বহনকার্য নদীবাহিত বোঝার পরিমাণ উপর বহুলাংশে নির্ভর করে । অর্থাৎ, একটি নদী বৃহদাকার প্রস্তরখন্ড যে পরিমাণে বহন করতে পারবে, তা অপেক্ষা ক্ষুদ্রাকার প্রস্তরখন্ড ঐ নদীটি অধিক পরিমাণে বহন করতে পারবে ।
এবং
৬. উপত্যকার প্রকৃতিঃ নদী উপত্যকার আকৃতির উপরেও নদীর বহনকার্য অনেকাংশে নির্ভর করে । অমসৃণ ও আঁকাবাঁকা নদী উপত্যকায় নদীর বহনকার্য বিঘ্নিত হয় । তুলনায় নদী উপত্যকা অপেক্ষাকৃত মসৃণ ও সোজা নদী অধিক পরিমাণে বহনক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকে ।

নদীর বহনকার্যের প্রক্রিয়াসমূহঃ নদীর বহনকার্য মূলত নিম্নলিখিত চারটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করে থাকে । যথা –
১. লম্ফদান প্রক্রিয়ায় বহন: মাঝারি থেকে বৃহৎ আকৃতির শিলাখন্ডগুলি নদীর স্রোতের টানে নদীখাতের সাথে ধাক্কা খেয়ে লাফাতে লাফাতে অগ্রসর হয়ে অন্যত্র বাহিত হয় । বৃহদাকার প্রস্তরখণ্ডগুলি লম্ফদান করতে করতে একবার নদীর তলদেশে বা গর্তে ( bed ) ঠেকে পুনরায় লম্ফদান করে চলতে থাকে । একে লক্ষদান প্রক্রিয়ায় ( Saltation process ) বহন বলে ।
২. ভাসমান প্রক্রিয়ায় বহন: অপেক্ষাকৃত হালকা, ক্ষুদ্রাকার প্রস্তরখন্ড, বালি, পলি, কর্দম কণা প্রভৃতি নদীর স্রোতের সাথে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে অগ্রসর হয় । একে ভাসমান প্রক্রিয়ায় বহন বলে । অনেক সময় ক্ষুদ্রাকার প্রস্তরখণ্ড নদীর স্রোতে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে ভেসে যায় , একে ভাসমান বােঝা ( Suspended load ) বলে । এইভাবে নদী তার বােঝা ভাসমান অবস্থায় বহন করে থাকে ।
৩. টান বা আকর্ষন প্রক্রিয়ায় বহন: নদীর প্রবল স্রোতের টানে অপেক্ষাকৃত বড় বড় শিলাখন্ডগুলি নদীর তলদেশ দিয়ে গড়াতে গড়াতে অগ্রসর হয় । নদী – বাহিত বিভিন্ন দ্রব্যসমূহ নদীর তলদেশ দিয়ে স্রোতের টানে বাহিত হয় বলে এদের নদীগর্ভ বােঝা ( Bed load ) বা টান বা আকর্ষণ বােঝা ( Traction load ) বলা হয় । অবশ্য এই প্রক্রিয়ায় কেবলমাত্র বড় বড় শিলাখন্ডই নয়, নুড়ি-বালি-কাকর প্রভৃতিও পরিবাহিত হয় ।
৪. দ্রবণ প্রক্রিয়ায় বহন: বিভিন্ন প্রকার লবনশিলা, চুনাপাথর প্রভৃতি নদীর গতিপথে অবস্থান করলে তা নদীর জলপ্রবাহের সংস্পর্শে এসে দ্রবীভূত হয়ে যায় এবং ঐ দ্রবীভূত অবস্থাতেই স্থানান্তরে পরিবাহিত হয় । একে নদীর দ্রবণ প্রক্রিয়ায় বহন বলে । নদী তার গতিপথে অনেক সময় কোন কোন প্রস্তরখণ্ডকে জলের সাহায্যে দ্রবীভূত করে তা জলস্রোতের সাথে বহন করতে থাকে । চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চলে নদী এই দ্রবণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বহন করে থাকে ।