জলপ্রপাত (Waterfalls):

☻সংজ্ঞাঃ পার্বত্য প্রবাহে নদীর গতিপথে কঠিন শিলা ও কোমল শিলা অনুভূমিকভাবে অবস্থান করলে নদীর প্রবল স্রোতের ফলে কোমল শিলা কঠিন শিলা অপেক্ষা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে খাঁড়া ঢাল সৃষ্টি করে । ফলে নদী ঐ খাঁড়া ঢালের উপর দিয়ে সরাসরি নিচে পড়তে থাকে । একে জলপ্রপাত (Waterfalls) বলে ।

উদাঃ পৃথিবীতে মোট ৩৭ টি প্রধান জলপ্রপাতের মধ্যে ভারতে আছে ২ টি । এই দুটি জলপ্রপাত হল সরাবতী নদীতে সৃষ্ট জেরসোপ্পা জলপ্রপাত বা যোগ জলপ্রপাত (উচ্চতা প্রায় ২৫৩ মিটার) এবং কাবেরী নদীর উপর শিবসমুদ্রম জলপ্রপাত । এছাড়াও, পৃথিবীর অন্যান্য প্রধান জলপ্রপাতগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলার রিও কারোনি (Rio Caroni) নদীতে সৃষ্ট অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাত (উচ্চতা প্রায় ৯৭৯ মিটার) যেটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ জলপ্রপাত, কানাডার সেন্ট লরেন্স নদীতে সৃষ্ট নায়াগ্রা জলপ্রপাত, আফ্রিকার জাম্বেসী নদীতে সৃষ্ট ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত প্রভৃতি ।

জলপ্রপাত (Waterfalls)

জলপ্রপাত (Waterfalls)

গঠনঃ জলপ্রপাত মূলত নিম্নলিখিত কয়েক প্রকার বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গঠিত হয় । যথা –
ক) উচ্চপ্রবাহ বা পার্বত্য প্রবাহে নদীর গতিপথে কঠিন ও কোমল শিলা অনুভূমিকভাবে অবস্থান করলে নদীর নিম্নক্ষয়ের ফলে কোমল শিলা কঠিন শিলা অপেক্ষা দ্রুত ও অধিক ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে । ফলে একটি খাঁড়া ঢাল সৃষ্টি করে নদী উপর থেকে নিচে ঝাপিয়ে পড়ে জলপ্রপাত সৃষ্টি করে ।
খ) নদীর প্রবাহপথে আড়াআড়িভাবে কঠিন শিলা অবস্থান করলে সেই কঠিন শিলা পার্শ্ববর্তী কোমল শিলা অপেক্ষা কম ক্ষয়প্রাপ্ত হয় । ফলে তা উঁচু হয়ে থাকে এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলপ্রপাত সৃষ্টি হয় । আবার, এই কঠিন শিলা যদি কোমল শিলার উপর সমান্তরালভাবে অবস্থান করে তাহলে জলপ্রপাত খাড়াভাবে গড়ে ওঠে ।
যেমন – সেন্ট লরেন্স নদীতে সৃষ্ট নায়াগ্রা জলপ্রপাত, যার সংশ্লিষ্ট শিলাস্তরের উপরিভাগ কঠিন শিলা ডলোমাইট এবং নিম্নভাগ কোমল শিলা শেল (Shale) ও বেলেপাথর দ্বারা গঠিত ।
গ) অনেকসময় মালভূমির প্রান্তভাগ খাড়াভাবে হঠাৎ নেমে যায় । এর ফলে ঐ সকল মালভূমির প্রান্তভাগেও ছোট ছোট অনেক জলপ্রপাত সৃষ্টি হয় ।
যেমন – সুবর্ণরেখা নদীতে সৃষ্ট হুন্ড্রু (Hundru) জলপ্রপাত
ঘ) নদীর গতিপথে যদি কোনো চ্যতি থাকে তাহলে চ্যুতির উঁচু অংশ থেকে নীচু অংশে নদী লাফিয়ে পড়ে জলপ্রপাত সৃষ্টি হয় । এক্ষেত্রে চ্যুতির উঁচু অংশে যদি কঠিন শিলা ও নীচু অংশে যদি নরম শিলা থাকে তাহলে এই ধরনের জলপ্রপাত দীর্ঘস্থায়ী হয় ।
যেমন – আফ্রিকার জাম্বেসী নদীতে সৃষ্ট ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত
ঙ) হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে গঠিত প্রধান হিমবাহ উপত্যকা পার্শ্ববর্তী অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিমবাহ উপত্যকাগুলি থেকে অনেক গভীর হয়ে ঝুলন্ত উপত্যকা সৃষ্টি হয় । এই ঝুলন্ত উপত্যকা অঞ্চলে পরবর্তীতে নদী প্রবাহিত হলে জলপ্রপাত সৃষ্টি হয় ।

শ্রেণীবিভাগঃ প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী জলপ্রপাত তিনপ্রকার । যথা –
ক) খরস্রোত বা র‍্যাপিড (Rapid): জলপ্রপাতের প্রবাহপথের ঢাল কম হলে সেটি উপর থেকে ধাপে ধাপে নিচে নেমে আসে । একে খরস্রোত বা র‍্যাপিড (Rapid) বলে ।
উদাঃ জাইরে নদীতে এরূপ ১১ টি খরস্রোত বা র‍্যাপিড সৃষ্টি হয়ে নেমে এসে লিভিংস্টোন জলপ্রপাত তৈরী হয়েছে । এছাড়াও, ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলেও খরস্রোত বা র‍্যাপিড দেখা যায় ।
খ) কাসকেড (Cascade): র‍্যাপিড জলপ্রপাত আরও ছোট হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলপ্রপাত সৃষ্টি করে প্রবাহিত হলে তাকে কাসকেড (Cascade) বলা হয় ।
উদাঃ রাঁচির জোনহা জলপ্রপাত, উত্তর আয়ারল্যান্ডের টিয়ারস অব দ্য গ্লেন জলপ্রপাত প্রভৃতি
এবং
গ) ক্যাটারাক্ট (Cataract): উত্তাল জলপ্রপাত যখন প্রকান্ড জলধারারূপে ঢালের উর্দ্ধভাগ থেকে অনেক নীচে ঝাপিয়ে পড়ে তখন তাকে ক্যাটারাক্ট (Cataract) বলে ।
উদাঃ আফ্রিকার জাইরে নদীতে সৃষ্ট ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত

জলপ্রপাতের পশ্চাদপসারণ বা উৎসের দিকে সরণঃ
পার্বত্য প্রবাহে নদীর গতিপথে আড়াআড়িভাবে কোনো কঠিন শিলা অবস্থান করলে সেই কঠিন শিলাঅঞ্চল পার্শ্ববর্তী কোমল শিলাঅঞ্চল থেকে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে উঁচু হয়ে থাকে এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলপ্রপাতের সৃষ্টি করে ।
এই কঠিন শিলা যদি কোমল শিলার উপর সমান্তরালভাবে অবস্থান করে তাহলে জলপ্রপাত খাঁড়াভাবে গড়ে ওঠে । ক্রমশ কঠিন শিলার নীচে অবস্থিত কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় । এর ফলে বহুদিন পরে কঠিন শিলা কোমল শিলার উপর ঝুলতে থাকে এবং অবশেষে তা ভেঙ্গে যায় । এইভাবে জলপ্রপাত ক্রমশ উৎসের দিকে সরতে থাকে অর্থাৎ জলপ্রপাতের পশ্চাদপসারণ ঘটে ।
উদাঃ জলপ্রপাতের পশ্চাদপসারণের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল সেন্ট লরেন্স নদীতে সৃষ্ট নায়াগ্রা জলপ্রপাত । এর উপরিভাগ কঠিন ডলোমাইট শিলা এবং নিম্নভাগ কোমল শিলা শেল (Shale) ও বেলেপাথর দ্বারা গঠিত । এই জলপ্রপাতটি এভাবে পশ্চাদপসারণের ফলে প্রায় ১১ কিলোমিটারেরও বেশী পথ পিছিয়ে গেছে ।