আদর্শ নদী (Ideal River):

☻সংজ্ঞাঃ যে নদীর উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত গতিপ্রবাহে তিনটি অবস্থাই ( উচ্চ প্রবাহ, মধ্যপ্রবাহ ও নিম্নপ্রবাহ) সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়া যায়, তাকে আদর্শ নদী (Ideal River) বলে ।
অন্যভাবে বলা যায়, যে নদী তার ঢালকে ক্ষয়চক্রের দ্বারা সমুদ্রতলের ঢালের সাথে সমতা রেখে ক্ষয়, বহন ও সঞ্চয়কার্যের মাধ্যমে পর্যায়িত ঢালে পরিনত করে, তাকে আদর্শ নদী (Ideal River) বলে ।

উদাঃ প্রাকৃতিক দিক দিয়ে ভারতের গঙ্গানদী একটি আদর্শ নদী, যেটি হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ গুহা থেকে উৎপন্ন হয়ে গঙ্গা প্রায় ২০৭১ কিলোমিটার পথ প্রবাহিত হয়ে তার তিনটি প্রবাহই যথা –
১. ঊর্দ্ধপ্রবাহ– গোমুখ থেকে হরিদ্বার পর্যন্ত,
২. মধ্যপ্রবাহ– হরিদ্বার থেকে ধুলিয়ান (মতান্তরে রাজমহল) পর্যন্ত
এবং
৩. নিম্নপ্রবাহ– ধুলিয়ান (মতান্তরে রাজমহল) থেকে মোহনা পর্যন্ত সম্পূর্ণ করে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়ে সমাপ্ত হয়েছে ।

বৈশিষ্ট্যঃ আদর্শ নদী – র বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ-
ক) একটি আদর্শ নদী সর্বদা তার উৎসস্থলকে সমুদ্রতলের ঢালের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার কাজ করে ।
খ) একটি আদর্শ নদীর প্রাকৃতিকভাবে উচ্চপ্রবাহ, মধ্যপ্রবাহ ও নিম্নপ্রবাহ – এই তিনপ্রকার প্রবাহই বিদ্যমান ।
গ) আদর্শ নদী তার উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত বিস্তৃত ঢালকে মৃদুঢালে পরিনত করে ।

আদর্শ নদীর তিনটি প্রবাহঃ একটি আদর্শ নদীর (Ideal River) তিনটি প্রবাহ লক্ষ্য করা যায় । যথা – ক) উর্দ্ধপ্রবাহ বা পার্বত্য প্রবাহ (Upper Course Or, Mountain Course), খ) মধ্যপ্রবাহ বা সমভূমি প্রবাহ (Middle Course Or, Plain Course) এবং গ) নিম্নপ্রবাহ বা ব-দ্বীপ প্রবাহ (Lower Course Or, Deltaic Course) । নিম্নে এই তিনটি প্রবাহ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো –

ক) উর্দ্ধপ্রবাহ বা পার্বত্য প্রবাহ (Upper Course Or, Mountain Course):
সংজ্ঞাঃ উৎসস্থল থেকে সৃষ্টি হওয়ার পর নদীর যে প্রবাহ পার্বত্য অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়,তাকে উর্দ্ধপ্রবাহ বা পার্বত্য প্রবাহ (Upper Course Or, Mountain Course) বলে ।
উদাঃ গঙ্গোত্রী (গোমুখ) থেকে হরিদ্বার পর্যন্ত প্রায় ৩২০ কিলোমিটার গঙ্গার উর্দ্ধপ্রবাহ বা পার্বত্য প্রবাহ ।
বৈশিষ্ট্যঃ উর্দ্ধপ্রবাহ বা পার্বত্য প্রবাহ – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ভূমিভাগ খুব উচু-নীচু হয়; সেইজন্য নদী উচ্চপ্রবাহে বা পার্বত্য প্রবাহে খাড়া পর্বতগাত্র বেয়ে দুরন্ত গতিতে (প্রায় ২০-৩৫ কিলোমিটার / ঘন্টা) নিম্নদিকে প্রবাহিত হয় ।
খ) এই প্রবাহে প্রবল স্রোতের আঘাতে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে শিলাখন্ড ভেঙ্গে স্রোতের সাথে নিচের দিকে গড়াতে গড়াতে অগ্রসর হতে থাকে ।
গ) এই প্রবাহে নদীর পার্শ্বক্ষয় অপেক্ষা নিম্নক্ষয় বেশী হয় ।
ঘ) উর্দ্ধপ্রবাহে নদীর প্রধান কাজ ক্ষয়সাধন ও বহন হলেও অনেক সময় নদীঢাল হঠাৎ কমে গেলে সঞ্চয়কার্যও দেখা যায় ।
সৃষ্ট ভূমিরূপঃ উর্দ্ধপ্রবাহ বা পার্বত্য প্রবাহে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলি হলো – ‘V’ – আকৃতির উপত্যকা (‘V’-Shaped Valley) ও গিরিখাত (Gorge), ‘I’ – আকৃতির উপত্যকা (‘I’-Shaped Valley) ও ক্যানিয়ন (Canyon), জলপ্রপাত (Waterfall), মন্থকূপ (Pot-hole), অন্তবর্দ্ধ শৈলশিরা (Interlocking Spur), কর্তিত শৈলশিরা (Trunscated Spur) প্রভৃতি………[বিস্তারিত পরবর্তী পোষ্টগুলিতে] ।

খ) মধ্যপ্রবাহ বা সমভূমি প্রবাহ (Middle Course Or, Plain Course):
সংজ্ঞাঃ উচ্চপ্রবাহের পর নদী পার্বত্য অঞ্চল পরিত্যাগ করে সমভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে, একে নদীর মধ্যপ্রবাহ বা সমভূমি প্রবাহ (Middle Course Or, Plain Course) বলে ।
উদাঃ হরিদ্বার থেকে বিহারের রাজমহল মতান্তরে পশ্চিমবঙ্গের ধূলিয়ান পর্যন্ত গঙ্গার মধ্য প্রবাহ বা সমভূমি প্রবাহ ।
বৈশিষ্ট্যঃ মধ্যপ্রবাহ বা সমভূমি প্রবাহ – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ভূমিভাগের ঢাল অনেক কম হওয়ায় নদী উচ্চপ্রবাহ বা পার্বত্য প্রবাহ অপেক্ষা অনেক ধীরে প্রবাহিত হয় ।
খ) এই প্রবাহে পার্বত্য অঞ্চল থেকে বাহিত শিলাখন্ডগুলি নদীর শক্তি কমে যাওয়ায় এই প্রবাহে আর বহন করতে পারে না; ফলে এই শিলাখন্ডগুলি নদীর উভয়তীরে সঞ্চিত হয় । অবশ্য হাল্কা কর্দম কণা ও বালি ভাসমান অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে ।
গ) এই প্রবাহে নদীর পার্শ্বক্ষয় ও নিম্নক্ষয় উভয়ই চলতে থাকে ।
ঘ) এই প্রবাহে নদীর ক্ষয়সাধন ও বহন অপেক্ষা অবক্ষেপণ কার্য প্রাধান্য পায় ।
ঙ) এই প্রবাহে নদীতে জলের পরিমান বৃদ্ধি পায় ।
চ) এই প্রবাহে নদী ক্রমশঃ ধীর গতিসম্পন্ন হয়ে আঁকাবাঁকা পথে চলতে থাকে ।
ছ) বহু উপনদী এই প্রবাহে প্রধান নদীর সাথে মিলিত হয় ।
জ) এই প্রবাহে নদী সাধারনত নাব্য হয় ।
সৃষ্ট ভূমিরূপঃ মধ্যপ্রবাহ বা সমভূমি প্রবাহে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলি হলো – পলল শংকু (Alluvial Cone) ও পলল ব্যজনী (Alluvial Fan), নদীচড়া (Sand Bank), নদীবাঁক (Meander), নদীমঞ্চ (River Terraces) প্রভৃতি………[বিস্তারিত পরবর্তী পোষ্টগুলিতে] ।
এবং

গ) নিম্নপ্রবাহ বা ব-দ্বীপ প্রবাহ (Lower Course Or, Deltaic Courses):
সংজ্ঞাঃ মধ্যপ্রবাহের পর থেকে মোহনা তথা নদীর সমাপ্তিস্থল পর্যন্ত নদীর শেষ বা অন্তিম প্রবাহকে নিম্নপ্রবাহ বা ব-দ্বীপ প্রবাহ (Lower Course Or, Deltaic Course) বলে ।
উদাঃ বিহারের রাজমহল মতান্তরে পশ্চিমবঙ্গের ধূলিয়ান থেকে বঙ্গোপসাগরে মোহনা পর্যন্ত প্রবাহ গঙ্গার নিম্নপ্রবাহ নামে পরিচিত ।
বৈশিষ্ট্যঃ নিম্নপ্রবাহ বা ব-দ্বীপ প্রবাহ -এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ভূমিভাগের ঢাল খুবই কম থাকায় নদী উচ্চপ্রবাহ বা মধ্যপ্রবাহ অপেক্ষা অনেক ধীরে প্রবাহিত হয় ।
খ) এই প্রবাহে পার্বত্য অঞ্চল থেকে বাহিত শিলাখন্ডগুলি নদীর শক্তি কমে যাওয়ায় এই প্রবাহে আর বহন করতে পারে না; ফলে এই শিলাখন্ডগুলি নদীর উভয়তীরে সঞ্চিত হয় । অবশ্য হালকা কর্দম কণা ও বালি ভাসমান অবস্থায় অগ্রসর হতে থাকে ।
গ) এই প্রবাহে নদীর নিম্নক্ষয় একেবারেই কমে যায় এবং সামান্য পরিমানে পার্শ্বক্ষয় চলতে থাকে ।
ঘ) এই প্রবাহে নদীর ক্ষয়কার্যবহনকার্য অপেক্ষা অবক্ষেপণকার্য সর্বাধিক প্রাধান্য পায় এবং নতুন নতুন ভূমিভাগ সৃষ্টি হতে থাকে ।
ঙ) এই প্রবাহে নদী উপত্যকা খুব চওড়া ও অগভীর হয় ।
সৃষ্ট ভূমিরূপঃ নিম্নপ্রবাহ বা ব-দ্বীপ প্রবাহে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলি হলো – প্লাবন ভূমি (Flood Plain) ও স্বাভাবিক বাঁধ বা লেভি (Natural Leeve), ব-দ্বীপ (Delta), খাঁড়ি (Estuary / Firth) প্রভৃতি………[বিস্তারিত পরবর্তী পোষ্টগুলিতে] ।

18 thoughts on “আদর্শ নদী (Ideal River):

  1. Pingback: নদীর শ্রেণীবিভাগ (Classification of River): – bhoogolok.com

  2. Pingback: ব-দ্বীপ (Delta): – bhoogolok.com

  3. Pingback: প্রধান নদী (Main Stream), উপনদী (Tributaries) ও শাখানদী (Distributaries): – bhoogolok.com

  4. Pingback: প্লাবনভূমি (Flood Plain): | bhoogolok.com

  5. Pingback: নদীবাঁক বা মিয়েন্ডার (Meander): | bhoogolok.com

  6. Pingback: পলল শংকু (Alluvial Cone): | bhoogolok.com

  7. Pingback: জলপ্রপাত (Waterfalls): | bhoogolok.com

  8. Pingback: ‘V’ – আকৃতির নদী উপত্যকা (‘V’ – shaped River Valleys) এবং গিরিখাত (Gorges): | bhoogolok.com

  9. Pingback: নদীর কার্যসমূহ (Works of River): | bhoogolok.com

  10. Pingback: নিত্যবহ নদী (Perennial River) ও অনিত্যবহ নদী (Non-perennial River): | bhoogolok.com

  11. Pingback: বরফগলা জলে পুষ্ট নদীঃ | bhoogolok.com

  12. Pingback: অন্তঃসলিলা নদী বা ফল্গু নদীঃ | bhoogolok.com

  13. Pingback: প্রধান নদী (Main Stream), উপনদী (Tributaries) ও শাখানদী (Distributaries): | bhoogolok.com

  14. Pingback: নদীর পার্শ্বচিত্র (River Profie): | bhoogolok.com

  15. Pingback: নদী উপত্যকা (River Valley): | bhoogolok.com

  16. Pingback: ধারণ অববাহিকা (Catchment Basin): | bhoogolok.com

  17. Pingback: নদী মোহনা (River Outfall): | bhoogolok.com

  18. Pingback: নদীর উৎস (River Source): | bhoogolok.com

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.