নদী উপত্যকা (River Valley):

☻সংজ্ঞাঃ নদীর এক তীর থেকে অপর তীর পর্যন্ত একটি রেখার দ্বারা যুক্ত করলে যে পার্শ্বচিত্র গড়ে ওঠে, তাকে নদী উপত্যকা (River Valley) বলে ।

বৈশিষ্ট্যঃ নদী উপত্যকা – র বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) নদীর ক্ষয়কার্যের সাথে সাথে নদী উপত্যকারও বিভিন্ন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় ।
খ) উপত্যকার গঠন বা আকৃতির উপর নদীর মোট জল পরিবহনের পরিমান ও গতিবেগ নির্ভর করে ।
গ) নদীগর্ভের বোঁঝার সাথে নদী উপত্যকার আকৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে ।

নিয়ন্ত্রকঃ  নদী উপত্যকা – র গঠন প্রধানতঃ তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে । যথা –
ক) প্রধান নদী ও তার উপনদীগুলির ক্ষয় করার শক্তির উপর, খ) নদী প্রবাহিত অঞ্চলের গঠন ও প্রস্তরের প্রকৃতির উপর এবং গ) নদীর অবস্থার উপর ।

শ্রেণীবিভাগঃ  নদী উপত্যকা – র গঠন-আকৃতি, পর্যায় প্রভৃতির উপর নির্ভর করে একে মূলতঃ তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় । যথা –
১. নবীন নদী উপত্যকা (Young River Valley):
সংজ্ঞাঃ উর্দ্ধপ্রবাহ বা পার্বত্য প্রবাহে নদীর প্রবল স্রোতের সাথে বাহিত প্রস্তরখন্ডের ঘর্ষণে নদীগর্ভ দ্রুত নিম্নক্ষয়ের ফলে সরু হয়ে ইংরাজী ‘V’-অক্ষরের মত আকার ধারণ করে, একে নবীন নদী উপত্যকা (Young River Valley) বলে ।
উদাঃ শতদ্রু নদী তিব্বত থেকে ভারতে প্রবেশ করার পথে উচ্চ হিমালয় বা হিমাদ্রী হিমালয়কে গভীরভাবে ক্ষয় করে একটি সুস্পষ্ট নবীন নদী উপত্যকা গঠন করেছে ।
বৈশিষ্ট্যঃ নবীন নদী উপত্যকা-র বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) নবীন নদী উপত্যকা মূলতঃ ইংরাজী ‘V’-অক্ষরের আকৃতির মত হলেও অপেক্ষাকৃত শুষ্ক অঞ্চলে জলের অভাবে নদীর জলতল অনেক নীচে অবস্থান করার ফলে নদীর পার্শ্বক্ষয় কমে গিয়ে ও নিম্নক্ষয় বেড়ে গিয়ে সুগভীর ইংরাজী ‘I’-অক্ষরের আকৃতিরও নবীন নদী উপত্যকা গঠিত হয়ে থাকে ।
খ) ‘V’-অক্ষরের আকৃতির মত নবীন নদী উপত্যকা আরও গভীর ও তীরভাগ খুব খাঁড়াই হলে তাকে গিরিখাত (Gorge) বলে [উদাঃ- পূর্ব হিমালয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের গিরিখাত, চীনের ইয়াং-সি নদীর ইছাং গিরিখাত প্রভৃতি ] ।
গ) ‘I’-অক্ষরের আকৃতির মত নবীন নদী উপত্যকা আরও গভীর ও খুব খাঁড়াই হলে তাকে ক্যানিয়ন (Canyon) বলে [উদাঃ- আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো নদীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ] ।
ঘ) নবীন নদী উপত্যকার দুপাশের ঢাল নদী ও আবহবিকার – উভয়ের যৌথ কার্যের ফলে গড়ে ওঠে ।
ঙ) কঠিন শিলাগঠিত অঞ্চলে নবীন নদী উপত্যকার ঢাল খুব খাঁড়াই ও নরম শিলাগঠিত অঞ্চলে শিলার দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্তির ফলে কম ঢালযুক্ত হয় ।

২. পরিনত নদী উপত্যকা (Mature River Valley):
সংজ্ঞাঃ উর্দ্ধপ্রবাহ বা পার্বত্য প্রবাহের পর থেকে নদী যতই সমভূমির দিকে অগ্রসর হতে থাকে নদীর নিম্নদিকে ক্ষয়ের থেকে পার্শ্বদিকে ক্ষয়ের মাত্রাও ক্রমশঃ বাড়তে থাকে । ফলতঃ মধ্যপ্রবাহ বা সমভূমি প্রবাহে নদী উপত্যকা ক্রমশঃ চওড়া হয়ে পড়ে । এইরকম নদী উপত্যকাকে পরিনত নদী উপত্যকা (Mature River Valley) বলে ।
উদাঃ হরিদ্বারের পর থেকে বিহারের রাজমহল মতান্তরে পশ্চিমবঙ্গের ধূলিয়ান পর্যন্ত গঙ্গা নদীর মধ্য প্রবাহে এরূপ পরিনত উপত্যকা দেখতে পাওয়া যায় ।
বৈশিষ্ট্যঃ পরিনত নদী উপত্যকা-র বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) পরিনত নদী উপত্যকায় নদীর জলপ্রবাহের গতিবেগ নবীন নদী উপত্যকা অপেক্ষা কমে যায় ।
খ) নদী উপত্যকার এইরূপ অবস্থায় নদীতে জলের পরিমান বৃদ্ধি পায় ।
গ) এইসময় নদীগর্ভের বোঁঝার সাথে নদী উপত্যকার আকৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায় ।
এবং

৩. প্রবীণ নদী উপত্যকা (Old River Valley):
সংজ্ঞাঃ পরিনত নদী উপত্যকাবিশিষ্ট মধ্যপ্রবাহ থেকে নিম্নপ্রবাহ বা ব-দ্বীপ প্রবাহে নদী যতই অগ্রসর হয়, নদী উপত্যকা ততই আরও চওড়া ও অগভীর হতে থাকে । এইসময় নদী উপত্যকা ক্রমশঃ বিশেষ চওড়া হয়ে প্রবীণত্ব লাভ করে এবং নদী তার বিস্তীর্ণ উপত্যকার একাংশ দিয়ে ধীরগতিতে এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয় । নদীর শেষ পর্যায়ে সৃষ্ট এরূপ সর্বাধিক প্রশস্ত উপত্যকাকে প্রবীণ নদী উপত্যকা (Old River Valley) বলে ।
উদাঃ গঙ্গা নদীর বার্ধক্য পর্যায়ে অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের ধূলিয়ান থেকে বঙ্গোপসাগরে মোহনা (ভাগীরথী-হুগলী প্রবাহ) অবধি এরূপ প্রশস্ত প্রবীণ নদী উপত্যকা বর্তমান ।
বৈশিষ্ট্যঃ প্রবীণ নদী উপত্যকা – র বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) এটি নদী উপত্যকার সর্বাধিক প্রশস্ত ও অগভীর অবস্থা ।
খ) উপত্যকার অধিকাংশই পলিমাটি দ্বারা আবৃত থাকে ।
গ) এইপ্রকার নদী উপত্যকাসংশ্লিষ্ট প্রবাহের সময় নদীতে জলপ্রবাহের গতিবেগ সর্বাপেক্ষা কমে যায় ।