হিমবাহ (Glacier):

☻বুৎপত্তিগত অর্থঃ ল্যাটিন শব্দ ‘Glacies’ ও ফরাসী শব্দ ‘Glace’ শব্দের অর্থ ‘বরফ’ যা থেকে ‘Glacier’ বা ‘হিমবাহ’ শব্দটি এসেছে ।

সংজ্ঞাঃ হিমরেখার উপরে থাকে তুষারক্ষেত্র । সেখানে যে তুষারপাত হয় তা প্রথম অবস্থায় আলগা আলগা হয়ে পড়ে থাকে । ফরাসি ভাষায় একে নেভে (Neve) বলে । এই তুষারকণা ক্রমশ পরস্পরের সঙ্গে মিশে বরফের স্তরে (Ice Sheet) এ পরিণত হয় । ক্রমশ তা আরও জমাট বেঁধে ও আয়তনে বড় হয়ে বরফের স্তূপের আকার ধারণ করে । তারপর উপরের চাপ ও বরফের নিজস্ব উষ্ণতায় নীচের কিছু বরফ গলে গেলে সেই বরফের স্তূপ পর্বতের ঢালে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করে । এই চলমান বরফের স্তূপকে হিমবাহ (Glacier) বলে ।

উদাঃ যমুনা নদী যমুনোত্রী হিমবাহ থেকে সৃষ্টি হয়েছে ।

বৈশিষ্ট্যঃ হিমবাহ – এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক)
এটি অন্ততপক্ষে ১০০-১৫০ ফুট গভীর হয় ।
খ)
এটি খুব ধীরগতিসম্পন্ন কিন্তু চলমান হয় ।

শ্রেণীবিভাগঃ হিমবাহ প্রধানত তিন প্রকার, যথা –
(ক) উপত্যকা হিমবাহ (Valley Glacier) বা পার্বত্য হিমবাহ (Mountain Glacier): উচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কিংবা অতি উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে প্রচন্ড ঠান্ডার জন্য তুষার জমে সৃষ্টি যেসব হিমবাহ পর্বতের উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং যেসব হিমবাহ তাদের গতি প্রবাহকে পার্বত্য উপত্যকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে, তাদের পার্বত্য হিমবাহ বা উপত্যকা হিমবাহ (Mountain / Valley Glacier) বলে ।
উদাঃ ১) হিমালয়ের উত্তরে কারাকোরামের সিয়াচেন হিমবাহ (দৈর্ঘ্য ৭২ কিমি); বিয়াফো (৬৩ কিমি ) ও বলটারো (৫৮ কিমি), হিসপার (৫০ কিমি.) ও বাতুরা (৬০ কিমি); ২) কুমায়ুন হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ (দৈর্ঘ্য ৩৯ কিমি), কেদারনাথ (১৪ কিমি.) কাঞ্চন জঙ্ঘার জেমু হিমবাহ (দৈর্ঘ্য ২৬ কিমি) প্রভৃতি হিমালয়ের উপত্যকা হিমবাহগুলি পৃথিবীর অন্যতম ।
বৈশিষ্ট্যঃ এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ-  
ক) 
এর আয়তন অপেক্ষাকৃত কম ।
খ) 
এর গতি বেশি ।

(খ) মহাদেশীয় হিমবাহ (Continental Glacier): মহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে যে হিমবাহ অবস্থান করে, তাকে মহাদেশীয় হিমবাহ (Continental Glacier) বলে । আসলে সুমেরু ও কুমেরু অঞ্চল জুড়ে যে বিরাট বরফের স্তর দেখা যায় তাকেই মহাদেশীয় হিমবাহ বলে । তুষারযুগে মহাদেশগুলির অনেক অঞ্চল বরফের স্তর দ্বারা আবৃত ছিল । ধীরে ধীরে পৃথিবীর বায়ুমন্ডল – এর উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে মহাদেশীয় হিমবাহের বিস্তার হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে দুটি মেরু অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়েছে ।
উদাঃ অ্যান্টার্কটিকার ল্যাম্বার্ট হিমবাহটি পৃথিবীর দীর্ঘতম মহাদেশীয় হিমবাহ । গ্রিনল্যান্ডেও এই রকম হিমবাহ দেখা যায় ।
বৈশিষ্ট্যঃ এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) এর আয়তন অপেক্ষাকৃত বিশাল ।
খ) এটি অত্যন্ত ধীরগতিসম্পন্ন ।

(গ) পাদদেশীয় হিমবাহ (Piedmont Glacier): হিমবাহ যখন উঁচু পর্বতের থেকে নেমে এসে পর্বতের পাদদেশে বিরাট অঞ্চল জুড়ে অবস্থান করে, তখন তাকে পাদদেশীয় হিমবাহ (Piedmont Glacier) বলে । উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থিত পার্বত্য অঞ্চলের পাদদেশে উষ্ণতা কম থাকায় সহজেই পাদদেশীয় হিমবাহ সৃষ্টি হয় ।
উদাঃ আলাস্কার মালাসপিনা হিমবাহটি হল পৃথিবীর বৃহত্তম পাদদেশীয় হিমবাহের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ । এটি প্রায় ৪,০০০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত ।
বৈশিষ্ট্যঃ এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) পর্বতের পাদদেশে অবস্থান করে ।
খ) এর গতি অপেক্ষাকৃত কম ।

22 comments

Leave a Reply